কওমি সনদের স্বীকৃতি : পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক

কওমি সনদের স্বীকৃতি : পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক

ঢাকা ১৩ এপ্রিল ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি):

অধ্যাপক তোহুর আহমদ হিলালী :  ১১ই এপ্রিল ২০১৭ গণভবনে আল্লামা শফির নেতৃত্বে বিশিষ্ট আলেম-ওলামাদের এক সমাবেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস উত্তীর্ণদেরকে মাস্টার্সের সমমান দানের ঘোষণা দিয়েছেন। আলেমদের সাথে আলোচনা করে চূড়ান্ত রূপদানের জন্য তিনি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও সচিবদেরকে নির্দেশ প্রদান করেছেন। সাথে সুপ্রিম কোর্ট থেকে গ্রিক দেবীমূর্তি অপসারণেরও প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। অনেকের সাথে আমি নিজেও এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। আবার কওমি ওলামাদের একটি অংশসহ অনেকে এটাকে নেতিবাচক দেখছেন। দৈনিক ইনকিলাবে দেখলাম ৫১০জন আলেমের এক যৌথবিবৃতিতে এটার নিন্দা জানানো হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা যে, এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে কওমি মাদ্রাসা তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও দ্বীনের নির্ভেজাল খেদমতের যে ধারা চলে আসছে, তা ধরে রাখতে তারা সমর্থ হবে না এবং আলেম-ওলামারা সরকারের তাবেদারী শুরু করবে। এই বিষয় নিয়ে ফেসবুকে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক চলছে এবং অনেকক্ষেত্রে বিতর্কে আক্রমণাত্মক ভাষা প্রয়োগ করা হচ্ছে ও শালীনতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। আমার আপত্তি এখানেই। পক্ষ-বিপক্ষ থাকতেই পারে এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুক্তি পেশ করা যেতে পারে।

আমার জানামতে এখন পর্যন্ত কোন ইসলামী বা রাজনীতিক সংগঠন সরকারের এই পদক্ষেপের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন বক্তব্য পেশ করেনি। কেবল প্রথম আলোয় একজন কলামিস্ট ও একজন বামপন্থী রাজনীতিকের নেতিবাচক বক্তব্য লক্ষ্য করলাম। আমি মনে করি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা লাভের অধিকার সকলের রয়েছে। কওমি শিক্ষার্থীরা সুদীর্ঘকাল ধরে লেখাপড়া করে আসছে এবং তাদের এই লেখাপড়ার কোন স্বীকৃতি থাকবে না, এটা হতে পারে না এবং অনেক বিলম্বে হলেও সরকারের এই বোধোদয়কে সাধুবাদ জানাই। এই স্বীকৃতির পাশাপাশি আলিয়া মাদ্রাসা ও অন্যান্য বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মত কওমি শিক্ষকদেরও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা প্রদানের দাবী জানাচ্ছি এবং এক সময়ে হবে ইনশা-আল্লাহ। এজন্য কী প্রয়োজন সময়ই তা বলে দেবে এবং প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কওমি আলেমরা অগ্রসর হতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। এজন্য প্রয়োজন উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং আলিয়া মাদ্রাসাকে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বি বিবেচনা না করে দ্বীনের সকল খাদেমের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ-সম্প্রীতি গড়ে তোলা। আর এই সৌহার্দ-সম্প্রীতি দ্বীনেরই দাবী-‘মু’মিনরা পরস্পরের ভাই’। পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষপোষণ মু’মিনের পরিচায়ক নয়।

ফেসবুকে সমালোচকরা বলতে চাচ্ছেন যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সনদের স্বীকৃতি আদায় শাপলা চত্তরে শহীদদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠীর প্রতি ক্রমাগত হামলা-মামলা, অত্যাচার-নির্যাতন উপেক্ষা করে নিজেদের সামান্য স্বার্থ উদ্ধারে ভোটারবিহীন জালেম সরকারকে সমর্থন দান। আমি কোনটাই অস্বীকার করছি না। তারপরও বলবো এই আলেম-ওলামাদের প্লাটফরম কোন রাজনীতিক প্লাটফরম নয়। তাঁরা যদি নেক নিয়তে মনে করেন যে, মামলা-মোকদ্দমা ও পুলিশী হয়রানি সাথে করে তাঁদের মৌলিক কাজ শিক্ষাদান বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, বরং সরকারের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে নিজেদের মামলা-মোকদ্দমা প্রত্যাহারসহ কিছু দাবী-দাওয়া আদায় করে তাঁরা স্বচ্ছন্দে দ্বীনি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তাতে আমি কোন দোষ দেখি না। ইতোপূর্বে জামায়াত কেয়ারটেকার আন্দোলনে বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে মিলে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে এবং তার ফলশ্রুতিতে ১৯৯৬ সনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়েছিল। পরবর্তীতে জামায়াত নেতৃবৃন্দ জীবন দিয়ে প্রমাণ করলো যে, সে সময়ে তাঁরা ভুল করেছেন। রাজনীতিতে এ সব ভুল-ভ্রান্তি হয়েই থাকে এবং তার খেসারতও ভোগ করতে হয়। আমি মনে করি, এ সব ভুল কোন গুনাহ নয়। গুনাহ হবে তখনই যখন ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধার ও দ্বীনের ক্ষতিসাধনের কোন দুরভিসন্ধি থাকে। রাজনীতি বড় জটিল ও কুটিল বিষয়। সমালোচকরা বলছেন রাজনীতির স্বার্থেই আওয়ামী লীগ আলেম-ওলামাদেরকে কাছে টানছে। তাও সত্যি মনে করি এবং আরো মনে করি রাজনীতিক স্বার্থেই আওয়ামী লীগ জামায়াতের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছিল, আবার রাজনীতিক স্বার্থে জামায়াতের শীর্ষনেতৃবৃন্দকে একে এক ফাঁসি দিয়েছে, শাপলা চত্তরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ও আজকে আবার তাঁদেরকে গণভবনে নিয়ে এসেছেন এবং রাজনীতিক স্বার্থে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ফাঁসিতে বিএনপি নীরব ভূমিকা পালন করেছে। আওয়ামী লীগ দেশে বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-ফ্লাইওভার নির্মাণসহ দৃশ্যমান অনেক উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের উচ্চ বেতনস্কেল এবং প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও মিডিয়াকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পরও সুশাসনের অভাব এবং আলেম-ওলামা ও ইসলামীপন্থী জনগোষ্ঠীর ওপর দমন-পীড়নের কারণে জনসমর্থন নিজেদের পক্ষে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। কুমিল্লা পৌর নির্বাচন এবং ঢাকা বার ও সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচন তার উদাহরণ। জামায়াতের ওপর এত দমন-পীড়নের পরও কুমিল্লা পৌরনির্বাচনে তাদের ৪/৫জন কমিশনার নির্বাচিত হওয়া তাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিরই প্রমাণ বহন করে।

সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাই উত্তম। তারপরও অন্য কোন উপায়ে ক্ষমতাসীন হয়ে সরকার যদি সুশাসন কায়েম করে তাহলে আমার মতে ফিতনা সৃষ্টি কাম্য নয়। একটি সরকারের পরিবর্তনের দু’টি উপায় থাকে। একটি হলো-স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা, দ্বিতীয়টি হলো নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালানো অর্থাৎ পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করা এবং এ লক্ষ্যে জনমত গঠন করা। গত প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলে গৃহিত না হওয়ায় মনে হয় সরকার আগামীতে সকলের অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চায়। আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠীর সাথে বৈরীভাব দূর করার লক্ষ্যেই কওমি সনদের স্বীকৃতি, পাঠ্য বই-এ কিছুটা সংশোধন ও সুপ্রিমকোর্ট কোর্ট থেকে মূর্তি অপসারণের ঘোষণা। আমি মনে করি সরকার ও দেশের জন্য এটা একটি ইতিবাচক দিক। যুগ যুগ ধরে বৈরীতা নিয়ে একটি দেশ ও সমাজ চলতে পারে না। সরকার যেমন উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষকে তার দিকে টানছে। বিরোধী দলেরও উচিৎ হবে কওমি সনদের পাশাপাশি তাদেরকে আরো কাছে টানার মত সুযোগ-সুবিধা দানের পরিকল্পনা পেশ করা। ফেসবুকের বন্ধুদের বলবো ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠী কারো কিছু কল্যাণ হলে সেটাকে নিজেদের কল্যাণ মনে করে কিভাবে সেটাকে আরো বাড়ানো যায় সেব্যাপারে ভূমিকা রাখা আমাদের সবারই উচিৎ। কোন হিংসা-বিদ্বেষ নয়, পরস্পরের মাঝে সৌহার্দ-সম্প্রীতির মাঝেই রয়েছে কল্যাণ। বিরোধীতার জবাব বিরোধীতা নয়, ভুল হলে অত্যন্ত দরদ দিয়ে তা সংশোধন করে দেয়াটাই উত্তম। একজন প্রখ্যাত আলেমের দরস শুনেছিলাম। তিনি বলেছিলেন-‘মু’মিন হলো জিহবার মত, বারবার দাঁতের কামড় খেয়ে জিহবা ক্ষত-বিক্ষত হলেও সে সব সময় দাঁতের কোন ফাঁকে কী ঢুকে আছে তা অপসারণের জন্য সারাক্ষণ সচেষ্ট থাকে’। মু’মিন সবার জন্যই কল্যাণকামী, কারণ সেতো পরকালে বিশ্বাসী; তার রব তাকে এত পরিমাণ দেবেন যে, তার সব অতৃপ্তি পূরণ হয়ে যাবে। মু’মিন কখনই ভদ্রতা-শালীনতা অতিক্রম করতে পারে না। আমাদের কথা, কাজ, আচরণ, লেন-দেন কোন কিছু দ্বারা কেউ কষ্ট পাবে-এমনটি যেন কখনই না হয়, তাহলেই কেবল মু’মিন পরিচয় সার্থক হবে। আল্লাহপাক আমাদেরকে সদাচারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন। ১৩/০৪/২০১৭

Previous বিদ্বেষ ভুলে নতুনভাবে সংসার সাজান: পূর্ণিমা
Next পাহাড়ে চলছে বৈসাবি উৎসব

About author

You might also like

কলাম ০ Comments

অভিমানী লাকীর গানগুলো কী বলে গেলো / *আতিক হেলাল

ঢাকা ১ মে ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): *আতিক হেলাল : “আমায় ডেকো না.. ফেরানো যাবে না ফেরারী পাখিরা কুলায় ফেরে না ।। বিবাগী এ মন নিয়ে.. জন্ম আমার যায় না বাঁধা আমাকে কোন

কলাম ০ Comments

পাহাড়ি শোকগাঁথা / রিতা ফারিয়া রিচি

রিতা ফারিয়া রিচি : ১৫ জুন ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): ১৫১ জন মারা গেলো এ যাবৎ। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দবানে  গত মঙ্গলবার পাহাড়ধসে এ নিয়ে শতেক মানুষের মৃত্যু আর অগণণ

কলাম ০ Comments

ভালোবাসা হোক সার্বজনীন / মো. জাভেদ হাকিম

মো.জাভেদ হাকিম : আজকাল নব প্রজম্মের মাঝে একটা ভ্রান্ত ধারণা বেশ গভীর ভাবে প্রোথীত হয়েছে, প্রেম-ভালোবাসা শুধু বিপরীত লিঙ্গের প্রতিই হতে হয়। এরকম মানসিকতাই আজ নতুন প্রজম্মকে অন্ধকারের গলীতে ধাবিত

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply