অভিমানী লাকীর গানগুলো কী বলে গেলো / *আতিক হেলাল

অভিমানী লাকীর গানগুলো কী বলে গেলো / *আতিক হেলাল

ঢাকা ১ মে ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি):

*আতিক হেলাল : “আমায় ডেকো না.. ফেরানো যাবে না
ফেরারী পাখিরা কুলায় ফেরে না ।।
বিবাগী এ মন নিয়ে.. জন্ম আমার
যায় না বাঁধা আমাকে কোন পিছু টানের মায়ায়
শেষ হোক এই খেলা.. এবারের মতোন
মিনতি করি আমাকে হাসিমুখে বিদায় জানাও..”
এমনই একজন শিল্পী তিনি ছিলেন, যাঁর গানের কথায়, সুরে এবং গায়কীতে যেন ‘সবকিছু’ নিহিত থাকে। সংখ্যায় তিনি গেয়েছেন হয়তো কম, কিন্তু সুর করেছেন দেড় হাজারেরও বেশি। তবে যা-ই গেয়েছেন, যা-ই করেছেন, তা-ই মানুষকে নাড়া দিয়েছে। মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে।
তিনিই লাকী আখান্দ। লাকী আখান্দ একজনই। তিনি অদ্বিতীয়। তিনি সত্যিই অতুলনীয়।
সত্যি বলতে কি, তাঁর সবগুলো গানই জনপ্রিয়। এবং যুগপৎভাবে সঙ্গীতোত্তীর্ণ।
এ এক বিরল ঘটনা। সিনেমার বাইরে এমন সার্থক জনপ্রিয় সঙ্গীত-সৃষ্টির নজীর মেলা ভার। আর সেই কাজটিই করে গেছেন আমাদের বিরলপ্রজ সঙ্গীতস্রষ্টা লাকী আখান্দ। এমন একজন লাকীর জন্য সত্যিই আমরা অনেক “লাকী”।
কিন্তু সেই লাকীকে আমরা কিছু দিতে পারিনি। ‘রাজনীতির’ পদলেহন করতে পারেননি বলে রাষ্ট্রীয় পদক-পুরস্কারও জোটেনি তার কপালে! যেই লাকী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিকের দায়িত্ব পালন করে দেশকে স্বাধীন করেছেন, সেই লাকী কি পেরেছন স্বাধীনভাবে, স্বচ্ছলভাবে বেঁচে থেকে কাজ করে যেতে? পারেননি। আজ অভিমানী লাকী যখন সত্যি-সত্যিই চলে গেলেন আমাদেরকে চির বিদায় জানিয়ে, তখন আমরা অনেকেই অনেক বড়-বড় কথা বলছি, দুদিন পরে তাও বলব না. তাঁদের দায়িত্ব কি শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ?
আজ সত্যিই তিনি ফেরারী পাখির মতো বিবাগী মন নিয়ে চলে গেছেন তিনি। ফেরারী পাখি যেমন কুলায় (ঘরে) ফেরে না, তেমনি আমাদের লাকীও আর ফিরবে না কোনদিন। যেমনটি তিনি বলে গেছেন : “যায় না বাঁধা আমাকে কোনো পিছু-টানের মায়ায়..।” সত্যিই, কোনো পিছুটানই তাঁকে বেঁধে রাখতে পারেনি এই মায়ার পৃথিবীতে। আদরের কন্যা মাম্মিন্তির হাহাকারেও ফেরা হলো না অভিমানী শিল্পীর।আর কোনোদিন তাঁর সেই মায়াভরা কণ্ঠে শোনা হবে না “মামুনিয়া, মামুনিয়া” বলে আদরের ডাক। সবাইকে যে তিনি মিনতি করে বলে গেছেন : “শেষ হোক এই খেলা.. এবারের মতো। মিনতি করি আমাকে হাসিমুখে বিদায় জানাও..”।
এভাবেই হাসিমুখে বিদায় চেয়ে তনি কাঁদিয়েছেন সবাইকে..। দিয়ে গেছেন : “এই নীল মণিহার, এই স্বর্ণালী দিনে..।” বলে গেছেন : “শুধু মনে রেখো।..স্মরণের জানালায় দাঁড়িয়ে থেকে শুধু আমায় ডেকো..শুধু আমায় ডেকো..।”
তিনি কিন্তু সবাইকে ডেকেছিলেন। সবাইকে নিয়েই থাকতে চেয়ছিলেন। বলেছিলেন : “চলো না ঘুরে আসি অজানাতে..।” কিন্তু আজ অভিমানে তিনি একাই পাড়ি দিলেন সেই “অজানাতে”। কিন্তু, এতো ভালোবাসা, এতো শ্রদ্ধা, এতো মায়ায় তিনি বাঁধা পড়ে আছেন, তা তাঁর অভিমানী প্রস্থানেই কেবল পুরোটা অনুধাবনযোগ্য। তাই তিনি গেয়েছিলেন : “আগে যদি জানিতাম, তবে মন ফিরে চাইতাম, এই জ্বালা আর প্রাণে সহে না..ও মনো রে, কিসের তরে রয়ে গেলি তুই?..”
নিজের মনকেই নিজে প্রবোধ দিয়েছেন তিনি : কেন, কিসের আশায় এই থেকে যাওয়া, কিসের আশায় এই গান গাওয়া? কোনো বৈষয়িক প্রত্যাশা বা তেমন কোনো কামনা-বাসনা তাঁর ছিলো না। চাওয়া ছিলো শুধু শিল্পীসত্তার মূল্যায়ন। দেশ ও জাতি হিশেবে আমরা তাঁকে যেটা করতে পারিনি। ব্যর্থ হয়েছি। “কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে” বলে যিনি আমাদেরকে কিছু নান্দনিক সময় উপহার দিয়েছিলেন, তাঁকে আমরা কী উপহার দিয়েছি? তাই, আজ যতোই বলি না কেন, “লিখতে পারি না কোনো গান আজ তুমি ছাড়া”, কোনো কাজ হবে না। সেই লাকীকে আর ডেকেও পাবো না। তিনি আজ অনেক দূরে চলে গেছেন।এখন সেখান থেকেই তাঁর কথা আমরা শুনতে পাবো : …ভালোবাসা হৃদয়ে নিয়ে আমি বারেবার আসি ফিরে, ডাকি তোমায় কাছে..যেখানে সীমান্ত তোমার..।”
এমন আরো বহু গানের সুরস্রষ্টা ও সংগীত পরিচালক তিনি। অনেকগুলো গান তিনি নিজেই গেয়েছেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে গানটিই তাঁর পরশ পেয়েছে, সেটিই মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। এই প্রসঙ্গে গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলেন : আমার লেখা ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’ গানটির একটা জায়গা কোনোভাবেই করতে পারছিলেন না শিল্পী নিয়াজ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী। তিনি লাকীকে বললেন, ‘দোস্ত, জায়গাটা একটু সহজ করে দাও।’ লাকী বলেছিলেন, ‘দেখো, নিয়াজ, আমি যে গানটি করি, সেটা যদি বিশ-পঁচিশ বছর না বাঁচে, তাহলে করে লাভ কী? তুমি না পারলে আমি অন্য শিল্পী খুঁজব। না পেলে আমিই গাইব।’ শিল্পীর লক্ষ্য ও আত্মবিশ্বাস ছিল—আমি এটা করতে পারবই। এটাই ছিল তার শক্তি।”
লাকী আখান্দের সুর করা ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’ গানের শিল্পী সামিনা চৌধুরী বলেন : তিনি একজন অভিমানী শিল্পী ছিলেন। অভিমান করেই চলে গেলেন। কত আগে থেকে গান নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তিনি সুরের জাদুকর ছিলেন। গান আসত আর তিনি জাদুর মতো সুর দিয়ে গানটিকে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিতেন। একজন নির্লোভ মানুষ ছিলেন তিনি, শুধু তাঁর প্রাপ্যটুকুই চাইতেন। লাকী আখান্দ্ আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু সবার কাছে অনুরোধ থাকবে, মঞ্চ বা টেলিভিশনে যখন কেউ তাঁর গান গাইবেন, তা যেন শুদ্ধভাবে গাওয়া হয়। তাহলেই তাঁর গান সুন্দরভাবে সবার মাঝে বেঁচে থাকবে।” প্রথম আলো, ২৩ এপ্রিল ২০১৭।
এবার আমি একটু ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা বলবো। ১৯৯৪ সালের দিকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সাথে যুক্ত হয়েছিলাম। সেই সুবাদে সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি শামসুল অালম (বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী) ও সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আল মামুন প্রমুখের মাধ্যমে তখন লাকী আখান্দের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। চিত্রনায়ক ফেরদৌসও (নায়ক হবার আগে) তখন আমাদের সাথে ছিলেন। জানতে পারি, ১৯৮৬ সালে ছোট ভাই হ্যাপি আখান্দের মৃত্যুর পর খেকে নিজেকে সঙ্গীত থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন লাকী আখান্দ। বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট (পিআইবি)-এর তৎকালীন মহাপরিচালক মরহুম প্রফেসর ড. তৌহিদুল আনোয়ারের উদ্যোগে আমরা চলচ্চিত্র সংসদের পক্ষ থেকে লাকী আখান্দের সাথে যোগাযোগ করতে থাকি।ধানমন্ডির রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে আমরা তাঁকে নিয়ে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানও করেছিলাম, মনে পড়ে। শুধু তাই নয়, অবশেষে দীর্ঘ বিরতির পর তিনি তাঁর একটি একক গানের ক্যাসেটও বের করেছিলেন। অনেকেই জেনে বিস্মিত হবেন যে, তিনি তখন বিয়েও করেননি। তৌহিদুল আনোয়ার স্যার এবং আরও কয়েকজনের উদ্যোগে সম্ভবত ১৯৯৪ সালেই লাকী ভাইর বিয়ে দেয়া হয় এবং আমরা তাঁর আরমানিটোলার বাসায় সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।
আজ সেই প্রিয় লাকী ভাই কোথায় চলে গেছেন আমাদের উপর অভিমান করে! তাঁর কন্যা মাম্মিন্তি নূর আখান্দও আজ শিল্পী হয়েছে। কিন্তু বাবার সংস্পর্শ যে তার আরও কিছু দিন প্রয়োজন ছিল প্রকৃত শিল্পী হওয়ার জন্য। তারপরও তার শিল্পীসত্তা বিকশিত হোক, বাবার মতোই উদার হোক তার শিল্পীমন, সেই প্রত্যাশাটুকু রইলো।
তবে, লাকী আখান্দের মৃত্যুর পর শোকাকুল পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর বোন একটি আহ্বান রেখেছেন সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি, বিশেষ করে রাষ্ট্র তথা সরকারের কাছে। সেটি হলো : লাকী আখান্দের অমর সৃষ্টি গানগুলোর স্বীকৃতি-স্বত্ব ও রয়ালিটির ব্যবস্থা যেন করা হয়, যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে সেগুলো সেভাবে আবেদন রেখে যেতে পারে। আর, কোনো শিল্পীকে যেন লাকীর মতো এমন সুচিকিৎসার অভাবজনিত মৃত্যু বরণ করতে না হয়। উন্নত বিশ্বে লাকী আখান্দের মতো একজন গুণী শিল্পীর জীবনের এক বছরের শিল্পকর্মের রয়্যালিটি দিয়েই সারাজীবন স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে দেয়া সম্ভব বলে আমরা জেনেছি।
জীবদ্দশায় আমরা পারিনি, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরেও কি আমাদের বোধোদয় ঘটতে পারে না?
না হলে যে মৃত লাকীর আত্মাও আমাদের ক্ষমা করবে না। জীবিত লাকী যেমনটি ক্ষেদোক্তি করে বলে গেছেন : “এই পৃথিবী আমায় আজও কি ভোলাতে চায়? ভেঙে গেছি নিরাশায়..কী হবে ডেকে আমায়..?”
তবে, আমি আমাদের গানের পাখি লাকীর উদ্দেশে তাঁরই গানের ভাষায় এটুকুই বলবো : তোমার স্বাক্ষর অাঁকা সেই দিন আমার মনে সবুজ পাতার চিহ্ন এঁকে গেছে..।

Previous বৃষ্টিতে বিফলে মুশফিকের সেঞ্চুরি
Next রাজশাহীর পদ্মায় নিখোঁজ ৫ জনের মরদেহ উদ্ধার

About author

You might also like

কলাম ০ Comments

৮১ শতাংশ নারী-এমপি যৌন-হয়রানির শিকার! তাহলে অন্যদের কী অবস্থা?

ঢাকা ১০ এপ্রিল ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): মন্তব্য প্রতিবেদন : ৮১ শতাংশ নারী এমপি যৌন হয়রানির শিকার! তাহলে সাধারণ নারীর কী অবস্থা? আতিক হেলাল : “ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে ৮ম শ্রেণির এক ছাত্রীকে

কলাম ০ Comments

পাহাড়ি শোকগাঁথা / রিতা ফারিয়া রিচি

রিতা ফারিয়া রিচি : ১৫ জুন ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): ১৫১ জন মারা গেলো এ যাবৎ। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দবানে  গত মঙ্গলবার পাহাড়ধসে এ নিয়ে শতেক মানুষের মৃত্যু আর অগণণ

কলাম ০ Comments

ভালোবাসা হোক সার্বজনীন / মো. জাভেদ হাকিম

মো.জাভেদ হাকিম : আজকাল নব প্রজম্মের মাঝে একটা ভ্রান্ত ধারণা বেশ গভীর ভাবে প্রোথীত হয়েছে, প্রেম-ভালোবাসা শুধু বিপরীত লিঙ্গের প্রতিই হতে হয়। এরকম মানসিকতাই আজ নতুন প্রজম্মকে অন্ধকারের গলীতে ধাবিত

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply