নারী-নির্যাতন এবং ‘গর্বিত’ পিতার সমঝোতা-তত্ত্ব / অাতিক হেলাল

নারী-নির্যাতন এবং ‘গর্বিত’ পিতার সমঝোতা-তত্ত্ব / অাতিক হেলাল

ঢাকা ১৪  মে ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি):

আতিক হেলাল : দুটি ঘটনা দুই ঘরানার। তবে সমাজ ও রাষ্ট্র একটিই। সেটির নাম বাংলাদেশ। ঘটনার প্রকৃতিও প্রায় একই। ঘটনাস্থলও প্রায় এক। দুটি ঘটনাই রাজধানী ও এর আশেপাশের-এলাকার। একটি খোদ রাজধানীর অভিজাত এলাকার, অন্যটি ঢাকার পাশ্ববর্তি গাজীপুরের।

দুটি ঘটনাই নারী নির্যাতনের। একটি ঘটেছে দরিদ্র এক পালক পিতার কিশোরী কন্যার ‍উপরে, ঘটিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীর বখাটে পুত্র। অন্যটি ঘটেছে রাজধানীর বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীর উপরে, ঘটিয়েছে ধনী পিতার আদরের দুলালেরা।

তবে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ঘটো দুটি ঘটনার মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্যও রয়েছে। যেমন-প্রথম ঘটনাটিতে এক দরিদ্র পালক পিতা তার পালিত কিশোরী কন্যার উপর সংঘটিত যৌন-হয়রানির প্রতিবাদ করেন এবং এর প্রতিকার ও বিচার না পেয়ে কন্যাসহ নিজেও আত্মহত্যা করেন। আর দ্বিতীয় ঘটনাটিতে বিত্তশালী পরিবারের সন্তানের জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে হোটেলে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া দুই তরুণী। পরে পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে মাসাধিককাল ঘটনা গোপন রাখার পর ধর্ষকদের ধারণকৃত ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে থানায় মামলা করতে বাধ্য হয়েছেন ঐ দুই তরুণী।

প্রথম ঘটনার দরিদ্র পালক পিতার ভূমিকার কথা আমরা জেনেছি, এবার দ্বিতীয় ঘটনার “আসল” পিতার ভূমিকাটাও একটু জানা দরকার। অভিযুক্ত ধর্ষকদের একজন সাফাত আহমেদের পিতা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ “গুণধর” পুত্রের পক্ষে সাফাই গেয়ে গণমাধ্যমে বলেছেন : “ওই রাতে যদি কিছু হয়েও থাকে, তাহলে সমঝোতার ভিত্তিতেই হয়েছে।”

এখানেই শেষ নয়। এই ‘গর্বিত’ পিতা দিলদার `ধর্ষক’ পুত্রের কুকর্মের পক্ষে সাফাই গেয়ে আরও বলেছেন, “ আরে মিয়া, আমার পোলা আকাম (ধর্ষণ) করছ, তো কী হইছে ! জোয়ান পোলা, একটু আধটু তো ওসব করবেই। আমিওে তো করি..।” (যুগান্তর ১৩ মে ২০১৭)।

কী ভয়াবহ অবস্থা আমাদের সমাজের! ধর্ষক পুত্রের বিত্তশালী পিতার এমন বক্তব্যের পর দেশের একজন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক (মইনুল আহসান সাবের) ফেসবুকে প্রশ্ন করেছেন :  এই সমঝোতাটা কি বাপ-ছেলের সমঝোতা? মানে “ছেলে আর বাবার এই বিষয়ক সমঝোতা ছিল?”

চলুন, প্রথম ঘটনাটি আবার একটু দেখে আসি।

জীবনের মূল্য মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি। অমূল্য জীবনকে ঘিরে মানুষের যত স্বপ্ন, কত সংগ্রাম! তাহলে মেয়েসহ হযরত আলী কেন আত্মঘাতী হলেন?

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বাবা হয়ে পালিত মেয়ে আয়েশার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছিলেন না দরিদ্র হযরত আলী।তিনি উত্ত্যক্তকারীর বিচার চেয়েছেন। বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কোথাও বিচার পাননি। উল্টো আরও হয়রানির শিকার হয়েছেন। হুমকি পেয়েছেন। বিচার না পেয়ে অসহায় ও বিপন্ন বোধ করছিলেন এই বাবা। ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন। মনে জমেছিল চাপা ক্ষোভ। শেষে গত ২৯ এপ্রিল সকালে গাজীপুরের শ্রীপুর রেলস্টেশনের পশু হাসপাতাল-সংলগ্ন এলাকায় মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেন হযরত আলী।

হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম জানান, আয়েশাকে উত্ত্যক্ত করতো স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক। অভিযোগ নিয়ে ফারুকের বাবা ফজলু মিয়ার কাছে গিয়েছিলেন হযরত আলী। প্রতিকার পাননি। নিরুপায় হয়ে যান গোসিংগা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আবুল হোসেন ব্যাপারীর কাছে। তিনি হযরত আলীকে পাগল বলে তাড়িয়ে দেন। শেষমেশ যান শ্রীপুর থানায়। সেখানেও প্রতিকার পাননি তিনি (সূত্র: প্রথম আলো ১ মে ২০১৭)। অন্য পত্রিকায় আয়েশার ওপর শারীরিক নির্যাতনের বিবরণও এসেছে। এসেছে হুমকি ও মীমাংসার চেষ্টার তথ্যও (সমকাল ৩০ এপ্রিল ২০১৭)।

দরিদ্র হযরত আলী সমাজে সম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন কন্যাশিশুর নিরাপত্তা। কিন্তু সমাজ, প্রশাসন কী করেছ? বাবা-মেয়েকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর মুখে। এ কি আত্মহত্যা, নাকি হত্যা?

এমন করুণ একটি মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলে দেশর মানুষ হয়ত জানতেই পারত না এই ঘটনার খবর। দ্বিতীয় ঘটনাটিও অনুরূপ। একান্ত বাধ্য হয়ে শেষমেশ মামলা করতে না গেলে এটাও হয়ত আরও অনেক ঘটনার মতো চাপা থেকে যেতো প্রভাবশালীদের ক্ষমতা আর টাকার নিচে।

দ্বিতীয় ঘটনাটির সংক্ষিপ্তসার এ-রকম:

“ঘটনার সময় ওরা মদ্যপ ছিল, ওদের কথায় রাজি না হওয়ায় আমাদের চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে। ওদের অনেক অনুরোধ করছিলাম আমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ছাড়া পাইনি। বনানীর রেইনট্রি রেস্টুরেন্টে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীর একজন এভাবেই সেদিনের ‘ভয়াবহ ঘটনা’ নিয়ে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন : “এত ধনী মানুষের বিপক্ষে মামলা করে জেতার মতো পরিবারও আমাদের না। তাই চাইনি আমার পরিবার এতে জড়িয়ে পড়ুক। আমাদের যা হওয়ার হয়েছে। কিন্তু পরিবারকে বিব্রত করতে চাইনি। এ কারণেই এতদিন চুপ করেছিলাম। যখনই অনেকের কাছে শুনতে পেলাম তারা সেদিনের ঘটনার কথা জেনেছে, তখনই আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।”

৭ মে রবিবার রাতে ওই তরুণী একটি মিডিয়ার কাছে সেই ভয়াল রাতের কথা বলেন। নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী বলেন, ‘কেবল ধর্ষকদের শাস্তি চাই আমরা। নিজেদের পরিবারকে সমাজের কাছে বিব্রত করতে চাইনি বলেই এতদিন আইনের আশ্রয় নেইনি।’

গত ২৮ মার্চ পূর্বপরিচিত সাদাত আহমেদ ও নাইম আশরাফ তাদের পূর্বপরিচিত ওই দুই তরুণীকে জন্মদিনের দাওয়াত দেয় বনানীর কে ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বর ‘দ্য রেইনট্রি’ নামের একটি হোটেলে। সেখানে জন্মদিনের অনুষ্ঠান চলার সময় দুই তরুণীকে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরদিন বিষয়টি জানাজানি হলে হত্যার পর লাশ গুম করার ভয় দেখিয়ে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমে ভয়ে বিষয়টি কাউকে না জানালেও পরে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তারা মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আসামিরা প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় বনানী থানা পুলিশ প্রথমে তাদের মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে ফেসবুকসহ কিছু মিডিয়ার প্রচারের কারণে মামলা নিতে বাধ্য হয় বনানী থানা।তবে এই প্রতিবেদন লেখা অব্দি কোনো আসামীকে আটক কনরতে পারেনি পুলিশ বা গোয়েন্দারা।

হায় সেলুকাস !

Previous চিন্তাশীলতাকে নষ্ট করছে ফেসবুক-ইউটিউব: জাফর ইকবাল
Next চলতি অর্থবছরে জিডিপি হবে ৭.২৪ শতাংশ

About author

You might also like

কলাম ০ Comments

ব্যতিক্রমধর্মী টিম-এর প্রস্তাব: রাব্বুল ইসলাম খান

ঢাকা ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): বিপন্ন রোহিঙ্গাদেরকে সহযোগিতা করার নাম করেই সেখানে এখন অনেক প্রকারের ধান্ধাবাজও ভিড়েছে। শুরুতেই প্রথম অভিযোগ ছিল, নৌকা পার করে দেওয়ার শর্তে জনপ্রতি অনেক বড় অংকের

কলাম ০ Comments

কওমি সনদের স্বীকৃতি : পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক

ঢাকা ১৩ এপ্রিল ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): অধ্যাপক তোহুর আহমদ হিলালী :  ১১ই এপ্রিল ২০১৭ গণভবনে আল্লামা শফির নেতৃত্বে বিশিষ্ট আলেম-ওলামাদের এক সমাবেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস উত্তীর্ণদেরকে মাস্টার্সের

কলাম ০ Comments

ভালোবাসা হোক সার্বজনীন / মো. জাভেদ হাকিম

মো.জাভেদ হাকিম : আজকাল নব প্রজম্মের মাঝে একটা ভ্রান্ত ধারণা বেশ গভীর ভাবে প্রোথীত হয়েছে, প্রেম-ভালোবাসা শুধু বিপরীত লিঙ্গের প্রতিই হতে হয়। এরকম মানসিকতাই আজ নতুন প্রজম্মকে অন্ধকারের গলীতে ধাবিত

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply