রমজানে কোরআন তেলাওয়াত

রমজানে কোরআন তেলাওয়াত

১ জুন ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি):

এ মোবারক মাসে সালাফে সালিহিন তথা পুণ্যবান লোক রোজা রাখার মহান হুকুম পালনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য নফল ইবাদতের মধ্যে কোরআন তেলাওয়াতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। রমজানের পুরো মাসকে পবিত্র কোরআনের জন্য ওয়াকফ করে দিতেন। তাদের কেউ কেউ সাধ্যানুযায়ী অধিকবার কোরআন খতমের প্রতি মনোনিবেশ করতেন আর কারও কারও মনোযোগ থাকত কোরআনের গভীরে গিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিগূঢ় তথ্য ও রহস্যগুলো উদ্ঘাটন করা, কোরআনের মণিমুক্তাগুলো সংগ্রহ করা ইত্যাদি

রমজান কোরআন নাজিলের মাস। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘রমজান মাস হলো সেই মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য পথযাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)। অতএব কোরআনের সঙ্গে এ মাসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। স্বয়ং নবীজি (সা.) এর নিয়মে পরিণত হয়েছিল, পুরো বছর কোরআনের যে অংশগুলো নাজিল হতো, তিনি সবটুকু জিবরাঈলকে পুনর্বার পড়ে শোনাতেন এবং জিবরাঈলও তাকে পড়ে শোনাতেন। যে বছর নবীজি ইন্তেকাল করেন, সে বছর একে অপরকে দুইবার পড়ে শুনিয়েছেন। (বোখারি : ৩৬২৩; মুসলিম : ২৪৫০)।

সেজন্য এ মোবারক মাসে সালাফে সালিহিন তথা পুণ্যবান লোক রোজা রাখার মহান হুকুম পালনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য নফল ইবাদতের মধ্যে কোরআন তেলাওয়াতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। রমজানের পুরো মাসকে পবিত্র কোরআনের জন্য ওয়াকফ করে দিতেন। তাদের কেউ কেউ সাধ্যানুযায়ী অধিকবার কোরআন খতমের প্রতি মনোনিবেশ করতেন আর কারও কারও মনোযোগ থাকত, কোরআনের গভীরে গিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিগূঢ় তথ্য ও রহস্যগুলো উদ্ঘাটন করা, কোরআনের মণিমুক্তাগুলো সংগ্রহ করা ইত্যাদি। তাদের জীবনের এসব দিক আমাদের সামনে এলে আমরাও এমনটা করতে অনুপ্রাণিত হতে পারিÑ সেই প্রত্যাশায় এখানে কিছু উদ্ধৃতি পেশ করা হলো। বস্তুত পূর্বসূরিদের এমন পুণ্যময় কর্মপন্থা আমাদের জন্য আদর্শ ও অনুকরণীয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এরা এমন ছিল, যাদের আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেছিলেন। অতএব, আপনিও তাদের পথ অনুসরণ করুন।’ (সূরা আনআম : ৯০)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তোমাদের জন্য ইবরাহিম ও তার সঙ্গীদের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করো, তার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে।’ (সূরা আল মুমতাহিনা : ৪)। আরও এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা কর, তোমাদের জন্য তাদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।’ (প্রাগুক্ত : ৬)।
উদ্ধৃতিগুলো পাঠ করার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর জেনে রাখা ভালো হবে। কারও মনে সংশয় জাগতে পারে যে, এত কম সময়ে দ্রুত কোরআন খতমের কারণ ও বৈধতা কী? মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে রাজাব হাম্বলি (রহ.) বলেন, তিন দিনের কম সময়ে কোরআন খতম করতে হাদিসে যে নিষেধ এসেছে, তা সবসময় এমনটা করার বেলায় প্রযোজ্য। কিন্তু ফজিলতপূর্ণ সময় যেমন রমজান, বিশেষ করে রমজানের রাত; যেখানে কদরের রাত অনুসন্ধান করা হয় অথবা ফজিলতপূর্ণ স্থান যেমন, মক্কা, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা বাইরে থেকে মক্কায় প্রবেশ করে, তো এসব ক্ষেত্রে অধিক হারে কোরআন তেলাওয়াত করা মোস্তাহাব; স্থান ও সময়কে গনিমত মনে করে। এটি ইমাম আহমাদ ও ইসহাক প্রমুখ ইমামের মন্তব্য এবং অপরাপর আলেমের কর্মপন্থার সমর্থন করে। (লাতায়িফুল মাআরিফ; ইবনে রাজাব, ১৭১)
এবার তাহলে নির্ভরযোগ্য আরবি গ্রন্থাদি থেকে আহরিত বিক্ষিপ্ত এই উদ্ধৃতিগুলো একনজর দেখে নেয়া যাক :
রমজানে দুই রাতে কোরআন খতম
আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে কায়স আবু আমর আন নাখায়ি। ইমাম ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। ইবরাহিম নাখায়ি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আসওয়াদ রমজানের প্রতি দুই রাতে কোরআন খতম করতেন। তিনি মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময় নিদ্রায় যেতেন। আর রমজান ছাড়া অন্য মাসে তিনি প্রত্যেক ছয় রাতে কোরআন খতম করতেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা; যাহাবি : ৪/৫১)।
মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে কোরআন খতম
সাঈদ ইবনে জুবাইর ইবনে হিশাম। ইমাম, হাফিজুল হাদিস, কারি, মুফাসসির, শহিদ। একজন প্রথিতযশা আলেম। হাসান ইবনে সালিহ ওয়াকা ইবনে ইয়াস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, সাঈদ ইবনে জুবাইর রমজান মাসে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে কোরআন খতম করতেন। অবশ্য তখনকার যুগে লোক এশার নামাজ বিলম্ব করে আদায় করত। (প্রাগুক্ত, ৪/৩২৪)।
এক দিন ও এক রাতে তিন খতম
আবুল হুসাইন ইবনে হুবাইশ একদা আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সাহল ইবনে আতার আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, প্রত্যহ তার এক খতম হতো। আর রমজানে প্রতি এক দিন ও এক রাতে তিন খতম হতো। শেষ বয়সে কোরআনের নিগূঢ় রহস্য এবং সূক্ষ্ম জ্ঞান আবিষ্কার করার মানসে এক খতম শুরু করেছিলেন। ১০ বছর পর্যন্ত পড়েছেন। তবে খতম হওয়ার আগেই তিনি এ পৃথিবী ত্যাগ করেন। (আল মুনতাজাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম; ইবনুল জাওজি : ৬/১৬০)।
রমজানে ৬০ খতম
তাকি উবাইদ; মুরতাযা ইবনুল আফিফ আবুল জাওদ হাতিম ইবনুল মুসলিম ইবনে আবিল আরাবের জীবনালেখ্যে বলেন, তিনি ছিলেন দরিদ্র, তবে ধৈর্যশীল। সমাজে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ছিল। প্রতি মাসে তিনি কোরআনে কারিম ৩০ খতম করতেন, আর রমজানে করতেন ৬০ খতম। (সিয়ারু আলামিন নুবালা; যাহাবি : ২৩/১২)।
ইয়াহইয়া ইবনে নাসর বলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অনেক সময় রমজান মাসে কোরআনে কারিম ৬০ বার খতম করতেন। (তারিখে বাগদাদ; খতিব বাগদাদি : ১৩/৩৫৭)।
নামাজের ভেতরের তেলাওয়াত ছাড়াও…
আবু বকর ইবনুল হাদ্দাদ বলেন, আমি এ কথা শুনে আশ্চর্য বোধ করলাম আবার মুগ্ধও হলাম যে, ইমাম শাফিয়ি (রহ.) রমজানে নামাজের ভেতরের তিলাওয়াত ছাড়াও ৬০ বার কোরআন খতম করতেন। আমিও চেষ্টা করেছিলাম। তবে সর্বোচ্চ ৫৯ খতম করতে সক্ষম হয়েছি। আর রমজান ছাড়া অন্য মাসে ৩০ খতম করেছি।
তিন দিনে এক খতম
আবু আওয়ানা বর্ণনা করেন, আমি কাতাদা ইবনে দিআমা (রহ.) কে রমজানে কোরআনে কারিমের দারস দিতে দেখেছি।
সালাম ইবনে আবি মুতি বলেন, কাতাদা প্রতি ৭ দিন অন্তর কোরআন খতম করতেন। রমজান এলে প্রতি ৩ দিনে এক খতম করতেন। আর রমজানের শেষ দশকে তিনি কোরআন খতম করতেন প্রত্যেক রাতে। (প্রাগুক্ত, ৫/২৭৬)।
এক খতম লিখে তা ওয়াকফ করে দিতেন
কামাল ইসহাক ইবনে আহমাদ আল মাআররি। মুফতি, বুজুর্গ আলিম। তিনি সবসময় রোজা রাখতেন। নিজ সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ সদকা করে দিতেন। এক্ষেত্রে তার নিকটাত্মীয়দের প্রাধান্য দিতেন। আর প্রত্যেক রমজানে তিনি পূর্ণ এক খতম কোরআন লিপিবদ্ধ করতেন এবং তা ওয়াকফ করে দিতেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা; যাহাবি : ২৩/২৪৮)।
রমজানে নব্বই খতম
মুহাম্মাদ ইবনে জুহাইর ইবনে কুমাইর বলেন, আমার আব্বাজান রমজান মাসে কোরআন খতম হওয়ার সময়ে আমাদের সবাইকে একত্রিত করতেন। বস্তুত তিনি প্রত্যেক রাত-দিনে তিন খতম; এভাবে পুরো মাসে নব্বইবার কোরআনে কারিম খতম করতেন। (আল মুনতাজাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম; ইবনুল জাওজি : ৫/৪)।
সাত দিনে কোরআন খতম
ইবনে আবি শায়বা (রহ.) এর সূত্রে বর্ণিত, আবু মিজলাজ (রহ.) রমজানে মহল্লার মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি ৭ দিনে কোরআনে কারিম খতম করতেন। (আস সিকাত; ইবনে হিব্বান : ৫/৫১৮)।
প্রত্যহ এক খতম
ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল বোখারি (রহ.) রমজানে প্রত্যহ দিনের বেলায় এক খতম করতেন এবং তারাবির পর (তাহাজ্জুদ) সালাতে প্রতি তিন রাতে এক খতম তেলাওয়াত করতেন। (তারিখে বাগদাদ; খতিব বাগদাদি : ২/১২; তাবাকাতুস সুবকি : ২/২২৩, হাদয়ুস সারি মুকাদ্দামাতু ফাতহিল বারি; ইবনে হাজার : পৃ. ৪৮২)।
৩৩ খতম
খলিফা মামুন রমজানে ৩৩ বার কোরআনে কারিম তেলাওয়াত করে খতম করতেন। (তারিখে বাগদাদ : ১০/১৯০)।
রমজানে প্রত্যেক রাতে কোরআন খতম
উবাইদা ইবনে হুমাইদ মানসুর থেকে, তিনি মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আলী ইবনে আবদুল্লাহ আল আজদি (রহ.) রমজানের প্রতি রাতে কোরআন খতম করতেন। (তারিখে বাগদাদ, ৫/১৬৪)।
সারা দিনে এক আয়াত
অন্যদিকে এমনও বহু তথ্য পাওয়া যায় যে, মনীষীরা কোরআনের অর্থ ও মর্ম নিয়ে চিন্তা ও গবেষণাকর্মে রমজান কাটিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ বিগত শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এর কথা উল্লেখ করা যায়। তার সুযোগ্য ছাত্র আল্লামা ইউসুফ বানুরি (রহ.) বলেন, রমজানে কখনও কখনও এমন হতো যে, হজরত কাশ্মীরি (রহ.) সকালে কোরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করতে শুরু করেছেন এবং বিকাল পর্যন্ত একই আয়াত পুনরাবৃত্তি করে চলেছেন। ওই আয়াত নিয়ে গবেষণা এবং আয়াত থেকে শিক্ষা ও সূক্ষ্মতর তথ্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে। বস্তুত তার ওইসব গবেষণার একটি লিখিত রূপ হলো তার লেখা ‘মুশকিলাতুল কোরআন’ গ্রন্থটি।

Share Button
Previous বিমান দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেন সানি লিওন
Next মিরসরাইয়ে বজ্রপাতে ২জন নিহত আহত ৫

You might also like

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply