শূকরের মাংস ভ্যাট-মুক্ত, আর জনগণ হলো ভ্যাট-যুক্ত !

শূকরের মাংস ভ্যাট-মুক্ত, আর জনগণ হলো ভ্যাট-যুক্ত !

 

আতিক হেলাল, ঢাকা ৭ জুন ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি) : গত রবিবার (৪ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের আয়োজিত এক ইফতার-অ্নুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক মূর্তি অপসারেণ ও হেফাজতের সাথে কথিত সম্পর্ক স্থাপন প্রসঙ্গে তাঁর সরকারের সমালোচনাকারীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি কড়া ভাষায় বলেছেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। যারা শূকরের মাংস ও মদ-গাঁজা খেয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন, তারা পারভারটেড (বিকৃত)।”

একদিকে শূকরের মাংস ও মদ-গাঁজার বিরুদ্ধে সরকারের প্রধান নির্বাহী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমন স্পষ্ট বক্তব্য দিলেন, অন্যদিকে তার ঠিক তিন দিন আগে তাঁরই অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত আগামী অর্থ বছরের বাজেটে শূকরের মাংসের উপর থেকে ভ্যাট তুলে নিয়ে এটিকে আরও সুলভ বা সহজলভ্য করে দিয়েছেন।বলা চলে, তিনি শূকরের মাংস আমদানি ও খাওয়াকে উৎসাহিত করেছেন।

দেশের মানুষ তাহলে এ ব্যাপারে কার বক্তব্য বা কার অবস্থানকে সত্য বলে ধরে নেবে, সেটিই এখন বড় ধোঁয়াশা। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট নিয়ে রীতিমত তেলেসমাতি কারবার করা হয়েছে। বাজেটের আগে তিন মাস ধরে অর্থমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও স্টেক হোল্ডারদের সাথে যে প্রাক-বাজেট আলোচনা ও মতবিনিময় করলেন, তা কি পুরোটাই ছিল সাজানো ও লোক দেখানো? এমনটাই প্রশ্ন তুলছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা।

রূপপুর পারমাণিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রপাতিকে ভ্যাট অব্যাহতি তালিকায় রাখা হয়েছে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে।কিন্তু বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হলে কিন্তু গ্রাহককে আগামী মাস থেকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে।  বাইরে থেকে ‘জীবন্ত ঘোড়া, গাধা, খচ্চর ও ঘোটক’ আমদানি করলে কোনো ভ্যাট দিতে হবে না!  আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এসব পণ্যকে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, শূকরের মাংস, তাজা বা ঠাণ্ডা যেকোনোভাবেই আমদানি করা হোক না কেন তাতে কোনো ভ্যাট দিতে হবে না। পাশাপাশি লেটুস এবং চিকোরি, তাজা অথবা ঠাণ্ডা এবং নারিকেল, ব্রাজিল বাদাম এবং কাজু বাদাম, তাজা অথবা শুকনা খোলস বা আবরণ ছাড়ানো হোক বা না হোক তাকেও ভ্যাটের আওতায় বাইরে রাখা হয়েছে। সরকারের ফাস্ট ট্রাকের সব প্রকল্পের বেশির ভাগ সরবরাহ, নির্মাণ ও ইন্টারনেটকে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সাধারণ গ্রাহক সবাইকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করলে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হচ্ছে।
মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ২৬-এ এই ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকা দেয়া হয়েছে। এটিই বহুল আলোচিত ভ্যাট আইন হিসেবে আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

এ কেমন ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য! বাংলাদেশে কারা গাধা বা শূকরের মাংস আমদানি করে? তাদের অংশ বা কতটুকু? আগে ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকা ৫০০ মতো থাকলেও নতুন ভ্যাট আইনে তার সংখ্যা করা হয়েছে এক হাজার ৪৩টি। তার মানে, শুধু ‘লোক দেখানো’র জন্য ভ্যাট অব্যাহতি পণ্যের তালিকা লম্বা করা হয়েছে? কিন্তু এই লম্বা তালিকার  পণ্যসামগ্রী দেশের সাধারণ মানুষ  কেউ আমদানি করে কি?
ভ্যাট অব্যাহতি পণ্যের তালিকায় এমন কিছু পণ্য নাম দেয়া হয়েছে, যা দেশের মানুষ আগে কখনো শুনেছেন বলেও মনে হয় না। নতুন ভ্যাট আইনে বলা হয়েছে, জীবন্ত পক্ষীগুলো, যা গ্যালাস ডোমেস্টিকাস প্রজাতির পক্ষীগুলো, পাতিহাঁস, হংসী টার্কি এবং গিনি পক্ষীগুলো’ আমদানি ও সরবরাহকারীকে ভ্যাট প্রদান করতে হবে না। এসব পণ্যকে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকায় আরো রয়েছে, জীবন্ত গবাদিপশু’ জীবন্ত ভেড়া ও ছাগল, অন্যান্য জীবন্ত পশু, গবাদি পশুর গোশত, তাজা অথবা ঠাণ্ডা (২.৫ কেজি পর্যন্ত মোড়ক বা টিনজাত ছাড়া), ভেড়া অথবা ছাগলের গোশত, ঠাণ্ডা অথবা হিমায়িত (২.৫ কেজি পর্যন্ত মোড়ক বা টিনজাত ছাড়া), ঘোড়া, গাধা, খচ্চর অথবা ঘোটকের মাংস, তাজা, ঠাণ্ডা অথবা হিমায়িত (২.৫ কেজি পর্যন্ত মোড়ক বা টিনজাত ছাড়া)। গবাদি পশু, শূকর, ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া, গাধা, খচ্চর অথবা ঘোটকের ভোজ্য নাড়িভূঁড়ি, তাজা, ঠাণ্ডা, অথবা হিমায়িত (২.৫ কেজি পর্যন্ত মোড়ক বা টিনজাত ছাড়া)।
ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকায় আরো স্থান পেয়েছে শূকরের মেদবিহীন মাংস এবং গৃহপালিত পক্ষীগুলোর মেদ (গলানো নয়) তাজা, ঠাণ্ডা, হিমায়িত অথবা শুকনা। জীবন্ত মাছ। খোলকযুক্ত অথবা খোলক ছাড়ানো, জীবন্ত, তাজা, ঠাণ্ডা, হিমায়িত, শুকনা, লবণাক্ত বা লবণ পানিতে সংরক্ষিত শামুক জাতীয় প্রাণী, শামুক বা কাকড়া জাতীয় প্রাণী ছাড়া অন্যান্য জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণী জীবন্ত তাজা ঠাণ্ডা, হিমায়িত, শুকনা, লবণাক্ত বা লোনা পানিতে সংরক্ষিত। খোলকযুক্ত পাখির ডিম, তাজা, সংরক্ষিত বা রন্ধনকৃত। গাজর, শালগম, সালাদ বিটমূল, স্যালসিফাই, সেলিরিয়াক, মুলা এবং এই জাতীয় ভোজ্য মূল, তাজা অথবা ঠাণ্ডা।

এসব কোন গ্রহের মানুষের নিত্য প্রয়েঅজনীয় আইটেম, বলবেন কি মাননীয় অর্থমন্ত্রী?

Share Button
Previous অর্থমন্ত্রী দেশের সব মানুষকে পুতুল মনে করেন : কাজী ফিরোজ
Next বিএনপির ‘রূপকল্প ২০৩০’ বাস্তবায়ন স্পষ্ট নয় : প্রধানমন্ত্রী

You might also like

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply