ঘূর্ণাবর্তের ঘূর্ণিপাকে মধ্যপ্রাচ্যের ঘুরপাক

ঘূর্ণাবর্তের ঘূর্ণিপাকে মধ্যপ্রাচ্যের ঘুরপাক

জাফর পাঠান : ১২ জুন ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি):

মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক ঘূর্ণিপাকের ‘সৃষ্টিকারী’, ‘সহযোগীতাকারী’ এবং ‘ইন্ধনদানকারী’, সবাই এক খুরে মাথা কামালেও উদ্যেশ্যের পার্থক্য বিদ্যমান। দূর মহাদেশে বসে দাবার ঘুঁটি চাল দিয়ে যাচ্ছেন যিনি এবং যারা, তাদের ধর্মগত, অর্থগত, আধিপত্যগত মনোবাঞ্চনা পূরণই মুখ্য উদ্দেশ্য। এব্যপারে সিরিয়ায় মোতায়েন রুশ বাহিনীর কমান্ডার কর্নেল জেনারেল সের্গেই সুরোভিকিন (৯-৬-১৭) বলেছেন : দায়েশ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আমেরিকার যোগসাজশ রয়েছে। ওদের পৃষ্টপোষকতা ও উদ্যেশ্যের ব্যাপারে স্বীকৃতিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন খোদ মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ড্যানা রোহরবাকার, প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিতে দেয়া বক্তব্যে এই মন্তব্য করেন তিনি- ‘গত বুধবারে ইরানের রাজধানী তেহরানে সন্ত্রাসী হামলায় মার্কিন স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে’।ওদের কর্মকান্ডে পরিস্কার প্রতিভাত হয়, সারা বিশ্বের মুসলিম দেশগুলিকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে অধিনস্থ এবং নিঃশক্তি করে শোষণ করে যাওয়াই ওদের সুদূর পরিকল্পনা। আর এসব কর্মকান্ডে মধ্যপ্রাচ্যের ‘সহযোগীতাকরী’ বিনাভোটের সরকারগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য নিজেদের ক্ষমতাকে ধরে রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্ন রাষ্ট্রগুলির উপর আধিপত্য বহাল রাখা। আর ‘নেপথ্যে ইন্ধন দানকারী’ প্রকাশ্য মুসলিম বিদ্বেষী রাষ্ট্রটির উদ্দেশ্য সর্বগ্রাসী এবং ধ্বংসাত্বক। এই রাষ্ট্রটির ইচ্ছানুযায়ী পরিকল্পনা সফলতা পেলে- পুরো মধ্যপ্রাচ্য গিলে খেয়ে ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করবেনা।
এই ভয়ংকর সব রাহুগ্রাসী ঘূর্ণিপাক সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এই ঘূর্ণিপাককে আরো বেগবান করে দিয়ে গেছে মার্কিন ইতিহাসের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি সফর করতে এসে। তেল-গ্যাস সম্মৃদ্ধ রাষ্ট্র কাতারের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের মুষ্টিমেয় কিছু পাশ্চাত্যনির্ভর দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। যেই দাবীগুলি পাশ্চাত্য এবং ইসরায়েলের, সেই একই দাবী কাতারের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সম্পর্কচ্ছেদ করলো উক্ত গোটা কয়েক অনুগামী রাষ্ট্র। এই ঘটনায় অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেছিলো, ট্রাম্পের গ্রীন সিগন্যাল নিয়ে ইয়েমেনের মত কাতারেও সম্পর্কচ্ছেকারীরা হামলে পড়ে নাকি আবার। তবে এখন বোধহয় তা আর সম্ভব নয়। কারন- কাতারের আহ্বানে এরই মধ্যে রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরান কাতারের পাশে বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়ে নিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট সরাসরি ফোন দিয়েছে কাতারের আমীরকে। ঐদিকে তুরস্ক পার্লামেন্ট ত্বরিৎ গতিতে আইন পাশ করেছে কাতারে সৈন্য মোতায়েনের। ইরান জাহাজ ও বিমানের মাধ্যমে রসদ সরবরাহ ইতিমধ্যে শুরু করেছে।
তবে বাস্তবতা হলো মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সক্ষমতা এখন আর আগের মত একদিকে হেলানো নেই। স্বাধীনচেতা ও পোড় খাওয়া কিছু জাতি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যের হাল বেশ শক্তভাবেই ধরেছেন। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ওমান এখন আর পাশ্চাত্য ও তার অনুসারীদের অঙ্গুলী নির্দেশে চলেনা। ঐদিকে ইয়েমেনের উপর সামরিক জোট গঠণ করে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েও পরাজয়ের প্রহর গুনছে পাশ্চাত্যশক্তি ও তার দোসরেরা। লেবাননের স্বাধীনচেতা সংগঠন “হিজবুল্লাহ” এখন ক্ষেপনাস্ত্র শক্তিতে বিশ্বের অষ্টম সামরিক শক্তি। যার ক্ষেপনাস্ত্রের আওতায় আছে ইসরায়েলের প্রতি ইঞ্চি ভূমি। এখন আর লেবানন ও গাজার উপর যখন-তখন থাবা বসিয়ে মুসলিমদের মাংস ছিঁড়ে খাওয়া যায়না, ওদের শরীরের মাংসও খসে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রিয়দের কাছে সবচেয়ে আশাপ্রদ বিষয়টি হলো- বয়ে যাওয়া এত প্রলয় আগ্রাসন ইসলামিক রিপাবলিক “ইরান” প্রায় একাই সামাল দিচ্ছে। পাশ্চাত্য আর অনুগত দেশগুলির অভিযোগ- হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের হামাস সংঘটনকে সামরিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে ইরান। এবং ইয়েমেনে শিয়া-সুন্নিদের প্রতিনিধি ‘হুতি’ স্বাধীনতাকামীদের সাফল্যের পিছনেও নাকি ইরানের সহযোগীতা কাজ করছে। উপরোক্ত বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিস্কার হয়ে যায়, আর তা হলো- জনভিত্তির কাছে সামরিক শক্তি ও চক্রান্ত অসহায়। এখন তাই প্রমানিত হচ্ছে- সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, লেবানন ও গাজায়। সারা বিশ্ব থেকে ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেছে বেছে সদস্য সংগ্রহ করে এবং বিশ্বের আধুনিক সামরিক শিক্ষায় দীক্ষা দিয়ে এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রের জোগান দিয়ে আইএস গঠিত হলেও ওরা আজ পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। আর এই অসম্ভব বিজয়গুলি সহজতর হচ্ছে আন্তর্জাতিক নতুন সামরিক মেরুকরণে ঘুরে দাঁড়ানো পরাশক্তি রাশিয়ার সরাসরি সহযোগীতায়।
পাশ্চাত্য আর দোসরদের সর্বাত্বক প্রলয়লীলা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পরও ওরা থেমে নেই, নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তবে ওদের জন্য ভয়ংকর ও আতংকজনক সংবাদ হলো- যদি ওরা চলমান সংঘাতকে বা চক্রান্তকে মাত্রাগতভাবে আরো উচ্চমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তবে মধ্যপ্রাচ্যের পদলেহী ও অশান্তি সৃষ্টিকারী দেশগুলির মাটি থেকে ছাইভস্মের গন্ধ বের হবে এবং তপ্ত কড়াইয়ে খই ফোটার মত করে মাটি ফুটবে। পক্ষ-বিপক্ষ রাষ্ট্রগুলির ক্ষতির আনুপাতিক হার হবে ৩০% ও ৭০%। যারা নজর রাখছেন মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীর উপর, তাদের কাছে এই হার পরিস্কার হয়ে ধরা দিবে। আর যদি ঘূর্ণিপাক “সৃষ্টিকারী” ও “ইন্ধনদানকারী” রাষ্ট্রগুলি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যায়, তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবীরূপে দেখা দেবে। যেই কথাটি দুই বছর আগে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, তা হলো- ইরানে হামলা হলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবে।
তবে সর্বোপরি বর্তমান বাস্তবতায় মনে হয়না ওরা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ঘূর্ণিপাককে রূপান্তরের মাধ্যমে সাইক্লোন বা সুনামীতে রূপদান করবে। গত পরশু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন : সবার মনে রাখা উচিৎ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগলে, বিজয় দাবী করার মত কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা।
ছাগলের তৃতীয় ছানা কিছু রাষ্ট্র হটকারী স্বীদ্ধান্ত নিয়ে ইয়েমেনের মত অন্য দেশে হামলে পড়লেও পরাশক্তিগুলি নেপথ্য কারিগর হিসাবেই মেশিন অপারেটিং করে যাবে এবং তৃতীয় ছাগলছানাদের সম্মুখে ঠেলে দিয়ে খেলা খেলে যাবে। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে জড়াবেনা। যেমনটি ক্রিমিয়ার বেলায় পরাশক্তিরা তা ঘটায়নি। তাই মধ্যপ্রাচ্যের তৃতীয় ছাগলছানাদের উল্লসিত হওয়ার মত আনন্দ সংবাদ না পাওয়ার সম্ভাবনাই আপাতত ৯০% ।

জাফর পাঠান : কবি ও কলাম লেখক।

Previous জিতলো ইংল্যান্ড : সেমিতে গেলো বাংলাদেশ
Next তারা পালাবার সময় পাবে না, বেরুতেও পারবে না: খালেদা

About author

You might also like

কলাম ০ Comments

হায় রে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় / আতিক হেলাল

ঢাকা ৩ আগস্ট ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি):  আতিক হেলাল > ইউজিসি’র তথ্য মতে, দেশে ৩৮টি পাবলিক এবং ৮৪টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ১২২টি বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু এর  একটিও যেতে পারেনি বিশ্বের

কলাম ০ Comments

হৃদয়ের গহীনে বন্ধু তুমি ..

মো.জাভেদ হাকিম : আজকাল অধিকাংশ বন্ধু মহলে একটা অসুস্থ ধারণা বেশ গভীর ভাবে কাজ করে।বন্ধুর এগিয়ে যাওয়ার গল্পকে অনেকটাই অস্বিকার করে। এক সাথে চলা কোন বন্ধুর সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশে বেশ

কলাম ০ Comments

৮১ শতাংশ নারী-এমপি যৌন-হয়রানির শিকার! তাহলে অন্যদের কী অবস্থা?

ঢাকা ১০ এপ্রিল ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): মন্তব্য প্রতিবেদন : ৮১ শতাংশ নারী এমপি যৌন হয়রানির শিকার! তাহলে সাধারণ নারীর কী অবস্থা? আতিক হেলাল : “ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে ৮ম শ্রেণির এক ছাত্রীকে

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply