হায় রে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় / আতিক হেলাল

হায় রে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় / আতিক হেলাল

ঢাকা ৩ আগস্ট ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি):  আতিক হেলাল > ইউজিসি’র তথ্য মতে, দেশে ৩৮টি পাবলিক এবং ৮৪টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ১২২টি বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু এর  একটিও যেতে পারেনি বিশ্বের সেরা ২০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ! শুধু তাই নয়, আমাদের মহাদেশ এশিয়ার সেরা ৭০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকাতেও নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়।
র‌্যাংকিং ওয়েব অব ইউনিভার্সিটির তালিকায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েট)। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে যার অবস্থান ২১০৬-এ। আর দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে বিশ্বের ২৪৬২তম স্থানে। এরপরেই রয়েছে বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ।
৩১ জুলাইয় র‌্যাংকিং ওয়েব অব ইউনিভার্সিটির প্রকাশিত সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ব ‌র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা এক ডজন বিশ্ববিদ্যালয়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এই তালিকায় প্রথমেই রয়েছে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি। এরপর যথাক্রমে রয়েছে ম্যাসাচ্যুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি; স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি; কর্নেল ইউনিভার্সিটি; ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে; ইউনিভার্সিটি অব মেসিগান; কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, নিউ ইয়র্ক; ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন; ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলস; ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইসকনসিন, ম্যাডিসন; ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া এবং ইয়েলা ইউনিভার্সিটি।
বিশ্বসেরা তালিকার ১৩ ও ১৪তম স্থানে রয়েছে ইউরোপের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্বসেরা তালিকার ১৩ ও ১৪তম স্থানে রয়েছে ইউরোপের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়। সেগুলো হলো যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ।
ইউরোপের সেরা দশের তালিকায় থাকা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো যথাক্রমে সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, সুইজারল্যান্ড (বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ২০তম); ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (৩৪); ইউনিভার্সিটি অব ইডেনবার্গ (৫০); উতরেক্ট ইউনিভার্সিটি (৬০); হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি (৬৫); ইউনিভার্সিটি অব হেলসিঙ্কি (৬৬); ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব লিউভেন (৭৪) এবং বেলজিয়ামের জেন্ট ইউনিভার্সিটি (৭৮)।
তালিকায় এশিয়ার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়টি চীনের। ৩৭তম অবস্থানে আছে দেশটির পেকিং ইউনিভার্সিটি। ৪৫তম স্থানে আছে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; যা এশিয়ার দ্বিতীয় সেরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর বিশ্বের ৪৬তম ও এশিয়ার তৃতীয় স্থানেই আছে জাপানের ইউনিভার্সিটি অব টোকিও।
এশিয়ার সেরা দশের তালিকায় থাকা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো যথাক্রমে চীনের জিঝিয়াং ইউনিভার্সিটি (বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ৪৮তম); ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটি (৪৯); সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি, চীন (৫৭); ইউনিভার্সিটি অব হংকং (৬৮); সাংহায় জিআও তং ইউনিভার্সিটি (৭০); কিয়োটো ইউনিভার্সিটি, জাপান (৭৫) এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (৮৯)।
বাংলাদেশের সেরা দশের তালিকায় তৃতীয় স্থান থেকে যথাক্রমে রয়েছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (৩৩৭৬); জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (৩৪৯৪); শাহজালাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (৩৭১১); জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (৩৭১৭); খুলনা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (৩৯৬৪); ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (৪১০২) এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (৪৪৭৯)।

বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের মধ্যে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা এমন করুণ এবং লজ্জাজনক কেন? অন্য সবগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম, দেশের সবচেয়ে ‘কুলীন’ বিশ্ববিদ্যালয় বলে অহংকার করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সঙ্গীণ অবস্থা কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দেশের মানুষ এর আগেও অনেকবার পেয়েছে, অতি-সম্প্রতি আবারও পেলো। শুধু পেলোই না, দেশর মানুষ টেলিভিশন ও ফেসবুকের কল্যাণে স্পষ্টই দেখতে পেলো আরও একটি লজ্জাজনক দৃশ্য।

২০০৮ সালে মইন-ফখরুদ্দিন-সরকারের পর যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, তখন কোনোরকম নির্বাচন ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে নিয়োগ দেয়া হয় অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিককে।  এভাবে ৪ বছর ঐ পদে থাকার পর ২০১৩ সালে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশকে অগ্রাহ্য করে পূর্ণাংগ সিনেট তথা রেজিস্ট্রার্ড গ্রাজুয়েটদের মতামত ছাড়াই আবার ৪ বছরের জন্য দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি হন অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিক। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট গঠনের প্রক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে আইনে উল্লেখ করা আছে। এগুলো পুরোপুরি মেনে সিনেট গঠন করাটা আইনে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু এবারও সেই বাধ্যবাধকতা না মেনেই কথিত সিনেট অধিবেশনের মাধ্যমে তিন জনের ভিসি প্যানেল ‘নির্বাচন’  করা হয়েছে, যে প্যানেলে বর্তমান ভিসির নাম এবারও এক নাম্বারে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ টানা ৩য় বারের মতো ভিসি পদে থেকে হ্যাটট্রিক করার খায়েস দেখানো হয়েছে! গত ২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত এক ‘বিশেষ’ সিনেট অধিবেশনের নামে যা ঘটানো হলো, তাতে দেশের সর্বোচ্চ পাবিলিক বিশ্বিবিদ্যালয়ের আর কোনো মর্যাদা অবশিষ্ট আছে বলে মনে করার কারণ নেই। ঘৃণ্য কৌশলে বিদ্যমান আইনকে পাশ কাটিয়ে এই ‘বিশেষ’ কারসাজির ভিসি প্যানেল তৈরির প্রধান সুবিধাভোগী বর্তমান ভিসি নিজেই। ভিসি প্যানেল নির্বাচনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এর ২০(১) ও ২১ (২) ধারার অপপ্রয়োগ করা হয়েছে। অনুকুল পরিবেশ, যথেষ্ট সময়, সুযোগ এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ২০(১) ধারার আলোকে এবারও পরিপূর্ণভাবে সিনেট গঠন করা হয়নি। এই ধারায় সিনেটে ১০৫ জন সদস্য থাকার বা্ধ্যবাধকতা থাকলেও ছিলেন মাত্র ৫৫ জন। অথচ কর্তৃপক্ষ বাকি ৫০টি শূন্যপদ পূরণের কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। এর মধ্যে ২০ জন মনোনীত, ২৫ জন নির্বাচিত রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি এবং ৫ জন ডাকসুর মনোনীত প্রতিনিধি। তাছাড়া, সিনেটের বিশেষ অধিবেশনের ক্ষেত্রে ২১(১) ধারা অনুযায়ী সিনেটের ৩০ সদস্যের লিখিত সুপারিশ প্রয়োজন ছিল। এখানে কোরামের বিষয় মুখ্য না হলেও প্রশাসন সেই কোরামের কথা্টাই তারস্বরে উল্লেখ করে বিষয়টি জায়েজ করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। (তথ্যসূত্র : প্রথম আলো ১ আগস্ট ২০১৭)।

সবচেয়ে বড় কথা্, দীর্ঘদিন ধরে ডাকসু নির্বাচন দাবী করা বিশ্বদ্যিালয়ের কয়েকটি ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এমন একটি জবরদস্তিমূলক সিনেট অধিবেশনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখানোর সময় সিনেট-ভবনে ঘিরে ‘বিশেষ প্রহরার’ দায়িত্ব পালনরত প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের সাথে কতিপয় শিক্ষক (বহিরাগতসহ)তাদের উপর হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটে শিক্ষক-শিক্ষার্থী নজিরবিহীন হাতাহাতি, ধাক্কাধা্ক্কি। এর মধ্য দিয়েই সম্পন্ন করা হলো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে ‘খ্যাত’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যাটট্রিক ভিসি মনোনয়নের প্যানেল ‘নির্বাচন’।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ধরনের নেতিবাচক রেকর্ড নিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কি বিশ্বের সেরা বিশ্ববিধ্যালয়ের সারিতে দাঁড়াতে পারবে? কখনও, কোনাদিন? একদিকে একাডেমিক যোগ্যতা আর উচ্চমানসম্পন্ন গবেষণায় যেমন পিছিয়ে, অন্যদিকে এই ধরনের নৈতিকতাহীন ‘রাজনৈতিক’ কর্মকাণ্ডের ফল তো আমাদের ভোগ করতেই হবে। যাতে দেশে এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

Previous আইনের শাসনের ভবিষ্যত নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন: প্রধান বিচারপতি
Next নাটোর-বগুড়া মহাসড়কে বাস চলাচল বন্ধ

About author

You might also like

কলাম ০ Comments

একটি মন খারাপ করা ছবি

ঢাকা ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): ম্যারিনা নাসরীন : দুদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি নানাজনের ওয়ালে ঘুরছে। আমি দেখেও দেখছি না। কারণ ছবিতে যে বৃদ্ধ মানুষটিকে দেখতে পাচ্ছিলাম তাঁর চেহারা দেখতে

কলাম ০ Comments

নারীর আবাসন সমস্যা/ কেয়া তালুকদার

ঢাকা ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): কেয়া তালুকদার : দিনশেষে রাতে ঘুমানোর জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় দরকার ৷ বিশেষ করে একটা নারী কখনো ঘরের বাইরে রাত কাটাতে পারে না ৷ কারণ নারী

কলাম ০ Comments

শূকরের মাংস ভ্যাট-মুক্ত, আর জনগণ হলো ভ্যাট-যুক্ত !

  আতিক হেলাল, ঢাকা ৭ জুন ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি) : গত রবিবার (৪ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের আয়োজিত এক ইফতার-অ্নুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক মূর্তি অপসারেণ ও হেফাজতের সাথে কথিত সম্পর্ক স্থাপন প্রসঙ্গে তাঁর সরকারের

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply