সেনাবাহিনীর বর্বরতায় বুচিডং ছেড়েছেন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা

সেনাবাহিনীর বর্বরতায় বুচিডং ছেড়েছেন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা

কক্সবাজার ১৮ অক্টোবর ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): নাফ নদীর ওপারে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা মংডু ও বুচিডংয়ের অবস্থিত মুসলমানদের সব হাটবাজার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। গত সোমবার একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। অন্য দিকে মিয়ানমারের সৈন্যদের বর্বরতার শিকার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বুচিডং ছেড়ে পালিয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা রোববার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত উখিয়া সীমান্তের আঞ্জুমানপাড়া পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, প্রায় দুই মাস ধরে সেনাবাহিনী, স্থানীয় রাখাইন ও বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ত্রিমুখী নির্যাতন চালাচ্ছে। পুড়িয়ে দেয়া হয় কয়েকটি গ্রাম। এরপরও অনেক রোহিঙ্গা বাপ-দাদার ভিটা ফেলে চলে আসতে চাননি। কিন্তু নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবন বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত তারা পালিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তে আসেন। বুচিডং জেলার নারাইংশং, কেপ্রুদং, লাবাদক, তংবাজার, থাম্মিংশং, বুজরাংশং, মগনামা, কোয়াইনডং, জাদীপাড়া, মিনগিছি অন্তত ২৩টি রোহিঙ্গা গ্রামের রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের সন্ধানে বাংলাদেশ সীমান্তে চলে আসেন। অবশ্য এর আগেও ওই সব গ্রাম থেকে অনেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। সৈন্যরা রোহিঙ্গাদের আটক করার পর দুই শতাধিক যুবককে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। ফলে আতঙ্কিত হাজার হাজার রোহিঙ্গা আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। এ ছাড়া কোয়াংসিবং সীমান্তে ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অপেক্ষা করছেন। এদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশি।

এ দিকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে রাতে নৌকায় দেড় হাজারের বেশি রোহিঙ্গা এসেছেন। এদের বেশির ভাগ বুচিডং ও রাচিডংয়ের বাসিন্দা। রোববার রাতে নাফ নদী পার হওয়ার সময় সাগরের মোহনায় নৌকা ডুবে নিখোঁজদের মধ্যে ১৪টি লাশ ও ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। অন্তত ২৫ জন রোহিঙ্গা। ফলে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের একজন মো: ইসমাইল (৬৫)। কোয়াইনদং গ্রামের এ বাসিন্দা বলেন, আরাকানে সহিংসতার পর থেকে তাদের বাজার বন্ধ রয়েছে। কোনো কাজকর্ম করতে পারছেন না। বাড়িতে খাবার নেই। ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেক দিন ধরে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছি। মগ সেনারা কোথাও দেখলেই আটক করে। বাড়িতে এক ধরনের অবরুদ্ধ হয়েছিলাম। তাই এপারে আসছে আসতে বাধ্য হয়েছি। লাবাদক এলাকার বদর উদ্দিনের স্ত্রী রহিমা খাতুন (৪৫) বলেন, এক বিভীষিকাময় ও অবরুদ্ধ পরিবেশ থেকে পালিয়ে এসে খোলা আকাশে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। অর্ধাহারে অনাহারে হাঁটতে হাঁটতে শরীর ক্লান্ত ও ব্যথা হয়ে গেছে। এ মুহূর্তে তাদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তের একটি চিংড়িঘেরে আশ্রয় নেয়া বুচিডং এলাকার বাসিন্দা মো: সোয়াইব (৩৮) জানান, আরাকানের ২০-২৫টি গ্রাম থেকে অর্ধলক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম রোববার রাতে আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। বুচিডংয়ের পাঁচকারিবিলা এলাকার ফাতেমা বেগম (৫৯) জানান, তার স্বামী মারা গেছেন মিয়ানমারে। ছেলে ও মেয়েরা আগেই বাংলাদেশে চলে এসেছে। আমি চেয়েছিলাম মিয়ানমারে থেকে যেতে। কিন্তু আমার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ায় উপায়ান্তর না দেখে বাংলাদেশে চলে এসেছি। আমি এখনো ছেলেমেয়েদের কাউকে খুঁজে পাইনি।

বুচিডং স্টেশন বাজারের বাসিন্দা নুরুল আলম (৫৫) বলেন, বুচিডং স্টেশনে আমার দু’টি দোকান আছে। এগুলোতে মিয়ানমারের মুদ্রায় অন্তত ১০ কোটি টাকার মালামাল ছিল। ১১ দিন আগে সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদী রাখাইন যুবকেরা আমার দু’টি দোকান লুটপাট করে ও পরে পুড়িয়ে দেয়। গ্রামের লোকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখে যাতে কেউ আগুন নেভাতে সহযোগিতা করতে না পারেন। কয়েকদিন না খেয়ে অনাহারে অনাধারে থাকার পর ছয় দিন হেঁটে আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তের মেদি এলাকায় পৌঁছি। রোববার রাতে কাঁটা তারের বেড়া পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকি।
ইলিয়াছ মিয়া নামের (২৫) আরেক রোহিঙ্গা যুবক বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে কথাবার্তা চলতে দেখে মনে করেছিলাম রাখাইনের পরিবেশ শান্ত হবে। কিন্তু বাস্তবে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। রাখাইন প্রদেশে নতুন করে বাড়িঘরে আগুন, রোহিঙ্গাদের এলাকা ছাড়ার জন্য মাইকিং করার পর থেকেই পালাচ্ছেন রোহিঙ্গা মুসলিমরা।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, অনুপপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সীমান্তের জিরো পয়েন্টে রাখা হয়েছে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও মানবিক সেবা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়াও যারা বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছেন তাদের আলাদাভাবে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রবেশ বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে আবাসন, স্যানিটেশন ও চিকিৎসা সমস্যা। সরকারি বনভূমি ও পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে ঝুপড়ি ঘর।
রোহিঙ্গাদের হাটবাজার বন্ধের নির্দেশ : রাখাইনের সীমান্তবর্তী মংডু ও বুথিডংয়ে অবস্থিত মুসলমানদের সব হাটবাজার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। গত সোমবার এ নির্দেশ দেয়া হয়।

সূত্র জানিয়েছে, অনেক রোহিঙ্গা জীবনবাজি রেখে এখনো বাড়িঘরে অবস্থান করছেন। এখন তাদের বিতাড়ন করার চেষ্টা করছে সেনারা। আগেকার মত গণহত্যা না চালালেও, গুপ্ত হত্যা, আটক বাণিজ্য, নিজ ঘরে আগুন দিতে বাধ্য করা, চাঁদাবাজি ও অবরুদ্ধ রেখে রোহিঙ্গাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে সেনা সদস্যরা।

উগ্রপন্থী রাখাইনরা প্রতিনিয়িত রোহিঙ্গাদের সাথে গায়েপড়ে ঝগড়া বাধাতে চাইছে। রোহিঙ্গা গ্রামে ঢুকে তাদের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ধান-চাল, শস্য, নারিকেল-সুপারি লুট করে নিচ্ছে। রোহিঙ্গারা বুঝতে পারছেন, এর প্রতিবাদ করলে রাখাইনরা আবার হামলা করবে।
এ দিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ দিয়ে হাটবাজার বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের রুজি-রোজগারের সব পথ বন্ধ করছে। হাটবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অচিরেই খাদ্য সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করবে। তখন রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগ ছাড়া বিকল্প থাকবে না।

অন্য দিকে এনভিসি নামের অভিবাসন কার্ড প্রত্যাখ্যান করায় আকিয়াবের রোহিঙ্গা জেলেদের নৌকা জব্দ করেছে সৈন্যরা। ফলে জীবিকার সন্ধানে বের হতে পারছেন না জেলেরা। মংডু, বুচিডং, রাচিডং এর পর সেখানেও মুসলমানদের নিপীড়ন শুরু করেছে। অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে আবারো দলে দলে বাংলাদেশে চলে আসছেন রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে ক্যাম্পে বন্দী করে রাখার পাঁয়তারা : মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিয়ে বাঙালি শরণার্থী হিসেবে ক্যাম্পবন্দী করার পাঁয়তারা করছে মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার কারণে যে সব রোহিঙ্গা গৃহহীন হয়ে পড়েছেন তাদের ঘরবাড়ি না থাকার অজুহাতে ক্যাম্পে বন্দী রাখার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে রোহিঙ্গাদের সূত্রে জানা গেছে। এর আগে আকিয়াবে ২০১২ সালে সংগঠিত জাতিগত সহিংসতার শিকার এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক ক্যাম্পবন্দী করে রেখেছে প্রশাসন। তাদের চাপ দিয়ে ন্যাশনাল ভেকেশন কার্ড (এনভিসি) নামের অকার্ড নিতে বাধ্য করছে মিয়ানমারের প্রশাসন। রোহিঙ্গারা এ কার্ড না নিতে চাইলে তাদেরকে নির্যাতন করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, মিয়ানমার সরকারের গঠিত কফি আনান কমিশনের সুপাবাস্তবায়ন করতে হলে রোহিঙ্গাদের নাগফিয়ে দিতে হবে। তাই আগে থেকেই এ দিয়ে রোহিঙ্গাদের অসাব্যস্ত করার পাঁয়তারা করছে মিয়ানমারের প্রশাসন।

কফি আনান প্রধান কমিশন গত আগস্ট মাসে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে রাখাইন রাজ্যের সঙ্কট সমাধানের লক্ষ্যে ৮২টি সুপারিশমালা পেশ করে। জাতিসঙ্ঘ এবং বিশ্ব নেতারাও এই সুপারিশ বাস্তবায়নে নানাভাবে চাপ দেয় মিয়ানমারকে। চূড়ান্ত প্রবেদনের আগে অং সান সু চি বললেন, কমিশন যা সিদ্ধান্ত দেবে তা মেনে নেবে সরকার। কিন্তু প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ার পর তা বাস্তবায়নে গড়িমসি শুরু করে মিয়ানমার সরকার। আনান কমিশনের এই সুপারিশমালা বাস্তবায়ন হলে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব পাবেন। কিন্তু মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে নারাজ।

সূত্র জানিয়েছে, গত শুক্র ও শনিবার আকিয়াবের সব ফিশিং ট্রলারের মালিক এবং ওই এলাকার জেলেদের ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক ছবি তুলে এনভিসি কার্ড দিতে চেয়েছে প্রশাসন। রোহিঙ্গারা এনভিসি নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মারধর করা হয়। জেলেদের মাছ শিকারে যেতে দেয়া হচ্ছে না। ট্রলারের লাইসেন্সের নামে হয়রানি ও ব্যবসায় বাণিজ্য করতে বাধা দিচ্ছে। দোকানপাট দখলে নিচ্ছে এবং জীবিকার সন্ধান করতে দিচ্ছে না প্রশাসন। গত বছরের শুরু থেকে রোহিঙ্গাদের এনভিসি নিতে চাপ দেয়া হচ্ছে।

এ দিকে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন ১০০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব রোহিঙ্গার বসতঘর অক্ষত না থাকলে তাদের ক্যাম্পে রাখা হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনমন্ত্রী উইন মিয়াত আইয়ি জানিয়েছেন, যাদের পরিচয় মিয়ানমারের সরকারের নথিতে থাকবে কেবল তাদেরই ফিরিয়ে নেয়া হবে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের চলতি মাসের শেষ দিকে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। প্রতিদিন ১০০ জন ফিরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে সে দেশের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন মন্ত্রী উইন মিয়াত আইয়ি বলেছেন, ‘আমাদের তাদের শনাক্ত করতে হবে। এরপর তাদের নিজেদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হবে। যদি তাদের বাড়িঘর সেখানে না থাকে তাহলে আপাতত তাদের জন্য নির্মিত অস্থায়ী ক্যাম্পে রাখা হবে।’

রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যের রাজধানী আকিয়াবে ২০১২ সাল থেকে এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে ক্যাম্পবন্দী করে রাখা হয়েছে।

Share Button
Previous যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ট্রান্সফরমার্স রোবট
Next ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কেট

You might also like

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply