কুষ্টিয়ার কুশলিবাসা-করিমপুরের যুদ্ধ / কাজী সাইফুল

কুষ্টিয়ার কুশলিবাসা-করিমপুরের যুদ্ধ / কাজী সাইফুল

কাজী সাইফুল, কুষ্টিয়া ৭ ডিসেম্বর ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি): সারা দেশের মুক্তিকামী বাঙালী যখন দেশকে পাকিস্তানি শোষক এবং ওদের দোসর রাজাকারদের হাত থেকে মুক্তকরে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীৃকতি এনে দেবার জন্য দেশকে শত্রুমুক্ত করতে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করছিলো তখন কুষ্টিয়া কুমারখালীতেও মুক্তিকামী সূর্য সন্তানরা দেশকে শত্রুমুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে ঠিক সারা বাংলাতে যখন পাকিস্তানী বাহিনী ও এদের দোসররা ৯ মাস চলা মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট একে একে পরাজিত হতে থাকে ঠিক সেই সময় স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষের দিকে একাত্তরের ৬ই ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কুষ্টিয়া কুমারখালী উপজেলার কুশলীবাসা, প্রতাবপুর, ধলনগর, ছাগলাপাড়া এবং কুষ্টিয়া সদর উপজেলার করিমপুর নামক স্থানে পাকিস্তানী আর্মি ও তাদের দোসরদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। ১৯৭১ সালের এর ৬ই ডিসেম্বর মুজিব বাহিনীর কমান্ডার জাহিদ হোসেন জাফরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা একটি গ্রুপের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। পাকিস্তানি আর্মি ও তাদের দোসরা এর পরই শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। কুশলীবাসা-করিমপুরের এই রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুুদ্ধে পাক আর্মি, রাজাকার ও মিলিশিয়াসহ ১৬ জন নিহত হয়। আহত হয় আরও ১১-১২। এদের মধ্যে এসএমজির ব্রাশফায়ারে মারা যায় তিনজন মিলিশিয়া। তখন যুদ্ধকালীন কমান্ডার হিসেবে করিমপুর এলাকায় ২৭ মুক্তিযোদ্ধার একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন কুমারখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার মোকাদ্দেস হোসেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে কুমারখালীর কুশলীবাসা, প্রতাবপুর, ধলনগর, ছাগলাপাড়া এবং কুষ্টিয়া সদর উপজেলার করিমপুর- এ পাঁচ গ্রামজুড়ে হানাদার পাকিস্তানী আর্মি ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ওই যুদ্ধটি ‘কুশলীবাসা-করিমপুর’ যুদ্ধ নামে পরিচিত। ওই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি গ্রুপ কালীগঙ্গা নদীর এপারে কুমারখালী এলাকায় এবং ওপারে করিমপুর এলাকায় অবস্থান নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে পাকিস্তানী আর্মিদের মোকাবেলা করে। সকাল নয়টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত চার ঘণ্টার এ যুদ্ধে প্রতাবপুর গ্রামের মহব্বত হোসেন খেরো, করিমপুর গ্রামের প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম শহীদ হন। এছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মাদ জাপান ও নাসির উদ্দিন মৃধা, জয়নাল আবেদীন, আবুল কালাম আজাদসহ আরও কয়েকজন পাকিস্তানী আর্মি হাতে আটক হন উজানগ্রামের সাবু বিন ইসলাম। তখন কমান্ডার মোকাদ্দেশ হোসেনের অধীনে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন নাছিম উদ্দিন আহমেদ, ছমির উদ্দিন, আকুব্বর আলী, খায়রুল ইসলাম, রামগোপাল প্রামাণিক, বিক্রমাদিত্য সাহা, আছির উদ্দিন, আকবর হোসেন গদাসহ অনেকে। একাত্তরের ৬ই ডিসেম্বরের কুশলিবাসা-করিমপুর যুদ্ধ সংঘটিত হয় মূলত ৫ সেপ্টেম্বর বংশীতলা যে যুদ্ধ হয় তার প্রতিশোধ নিতে ৩০ নভেম্বর পাক বাহিনী অতর্কিত হামলা চালিয়ে পান্টি বাজার ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। কয়েকজনকে হত্যাও করে। তারা ফিরে যাওয়ার পথে আমার এবং শৈলকুপার সাবেক এমপি গোলাম মোস্তফা গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ধাওয়া করে। এরই মধ্যে খবর আসে পাক হানাদাররা এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের উদ্দেশ্যে ৬ ডিসেম্বর সকালে পুনরায় পান্টি বাজারে প্রবেশ করবে। এ সংবাদ পাওয়ার পর জাহিদন হোসেন জাফর মুজিব বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে পান্টি বাজার থেকে চার কিলোমিটার দূরে ছাগলাপাড়া মাঠে এ্যাম্বুশ করে। এদিকে পাকিস্তানী আর্মিরা বুঝতে না পেরে এ্যাম্বুশে ঢোকামাত্র জাফর উল্লাহ জাফরি ও ইনসান আলী বাবু ব্রাশফায়ার করে। মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে পাক বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ক্যাম্পের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। জাহিদ হোসেন জাফরের নেতৃত্বে মুজিব বাহিনীর যোদ্ধারা তাদের ধাওয়া করে ধলনগর কালীগঙ্গা নদীর ঘাটের দিকে নিয়ে যায়। এ সময় ওই এলাকায় খন্দকার শামসুজ্জোহা গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধারা পেছন থেকে কভারিং করে। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে প্রতাবপুর গ্রামে পাকিস্তানি আর্মিদের গুলিতে মহব্বত হোসেন খেরো নামে এক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং জয়নাল আবেদীন, আবুল কালাম আজাদ ও শহীদুল ইসলামসহ কয়েকজন আহত হন। ১৯৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী আর্মি এবং তাদের দোসরদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় সেই যুদ্ধে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা গুরুত্বর আহত হয়। এই যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করতেই প্রতি বছর এই যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী অধিনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহিদ হোসেন জাফর সভাপতিত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ৬ই ডিসেম্বর কুশলিবাসা-করিমপুর যুদ্ধ দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।উপজেলা ও জেলার শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা সহ দিবসে গণমান্য ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত হয়ে সম্মুখ যুদ্ধে নিহত হওয়া শহীদদের স্মৃতিতে কুলশীবাসা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গনে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে উপহার সামগ্রী এবং খাবার বিতরন মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়।

Please follow and like us:
Previous রসিকে সেনা মোতায়েন চায় বিএনপি
Next কম্বোডিয়া সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

You might also like

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply