দৃষ্টি নন্দন মসজিদে নববী

দৃষ্টি নন্দন মসজিদে নববী

মো.জাভেদ হাকিম > ঢাকা ২২ ডিসেম্বর ২০১৭ (গ্লোবটুডেবিডি):
আলহামদুল্লিাহ আল্লাহপাক রাব্বুল আল-আমিন গেল হজে আমাকে কবুল করে নিয়েছিলেন, তাঁর পবিত্র ঘর বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করার। হজ শেষে চিরাচরিত নেশায় ঘুরে বেড়াই নানান দর্শণীয় জায়গায়। ভ্রমণ যেহেতু রক্তের সাথে মিশে গেছে, সেহেতু সুযোগমত ঘুরতেই হবে।তাছাড়া ভ্রমণ করাও সুন্নত। আর সেই রাসুল [সা.] দেশে গিয়েই গুটিয়ে থাকব তা কী করে হয়।এবাদত বন্দেগীর পাশাপাশি চলল ঘোরাঘুরি।মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার সময় পথের যে দৃশ্য তা লিখে বুঝানো সম্ভব নয় তবুও চেষ্টা করছি। আধুনিকতার মিশেলে তৈরী প্রশস্ত সড়কে গাড়ী যখন চলে, তখন এমনিতেই অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করেছে মনে। গাড়ী যতই এগিয়ে যায় ততই যেন সৌন্দের্যের ঘোরে নিমজ্জিত হতে থাকি। সারি সারি পাহাড়মালা,দৃষ্টিনন্দন সব ইমারত,আইল্যান্ডের মাঝে সারীবদ্ব খেজুর গাছ দেখতে দেখতে একসময় চোখে ধরা দিবে জনমানবহীন ধুধু মরুভূমি আর বিরাট বিরাট আকৃতির নানান রঙের পাহাড়। তপ্ত মরু ভূমির বুকে মাথা উঁচু করে থাকা বাবলা গাছ গুলো দেখে মনে হবে,এ যেন বিশাল শূন্যতার মাঝে একখন্ড সবুজ। কোথাও কোন মানুষের দেখা না পেলেও মরুভূমির জাহাজ নামে খ্যাত শত শত উট আর দুম্বার বিচরণ দেখেছি।সেসব দৃশ্যও ভ্রমণ পিপাসুদের নিকট অন্যরকম ভালোলাগার স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। মক্কা থেকে মদিনায় বাসে যাত্রা সময় প্রায় ৬ ঘন্টা। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়টা যেন খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে। আমাদেরও ফুরালো। বাস এসে থামল মদিনা শহরের বাঙ্গালী পট্টির বাংলাদেশ হজ মিশনের পাশে। এখানকারই এক আবাসিক হেটেলে আমাদের থাকার জায়গা ঠিক রাখা ছিল। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই সোজা আমি ও রুমমেট মন্টু কাকা এবং সৌদি অবস্থানকালীন আমাকে আপন চাচীর মত বেগম সামসুন্নাহারসহ চলে যাই হোটেল হতে অনতি দূরে মসজিদে নববী। নববীর প্রথম দর্শনেই চোখ জুড়িয়ে যায়। এখানে পুরুষ-মহিলাদের জন্য নামাজের স্থান পৃথক রাখা হয়েছে।চাচীকে মহিলাদের জায়গায় রেখে আমরা দুজন চলে যাই বাবে জিব্রীল গেটের দিকে। এই গেট দিয়েই রাসুল[সা.] নিকট জিব্রীল [আ.] ওহী নিয়ে প্রবেশ করতেন। ভাবতেই অন্যরকম লাগে।আমি এখন সেখানেই দাঁড়ীয়ে। আযান পড়ে। মাগরিবের নামাজ আদায় করি। দুনিয়ার বুকে যত গুলো মসজিদ রয়েছে তার মধ্যে গুরুত্বের দিক থেকে মসজিদে নববীর স্থান তৃতীয়। আর বরকতের দিক থেকে মসজিদুল হারামের পরেই মসজিদে নববীর স্থান। এই মসজিদে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে মুসলিম বিশ্বাস মতে তাঁর জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যায়। এরকম একটা মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারাটা ভ্রমণ জিন্দেগীতে এক অবিস্মরণীয় ব্যপার। মহানবী হযরত মোহাম্মদ [সাঃ] মসজিদে নববীকে “আমার মসজিদ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হুজুর [সাঃ] বলেছেন নববীর পরিধী যদি সাফা পর্যন্তও হয় তবুও তা আমার মসজিদ হিসেবে গন্য হবে।আল্লাহু আকবার,মসজিদটি যে কতটা বরকতময় তা রাসুল[ সাঃ] কথা হতে স্পষ্ট। এর নির্মাণের সময় তিনি নিজে সাহাবিদের সঙ্গে কাজ করেছেন।মদিনা হিজরতের পর হজুর [সাঃ] সর্ব প্রথম ইসলামের কর্মকেন্দ্র হিসেবে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজন বোধ করেন। তখন তিনি হযরত আবু আনসারির বাড়ীর সামনের এই খালী জায়গাটি পছন্দ করেন।জায়গার মালিক ছিল অল্প বয়সের এতিম দুই ভাই।তাদের নিকট জমিটি হুজুর [সাঃ] ক্রয় করার ইচ্ছে ব্যক্ত করলেন কিন্তু তারা বিনা মূল্যেই দিতে চাইলেন। হুজুর [সাঃ] দুই ভায়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বিনা মূল্যে না নিয়ে তৎকালীন বাজার মূল্য দশ দিনার দিয়ে ক্রয় করে নিলেন। মসজিদে নববীর প্রথম ভিত্তিও স্থাপন করেন আখেরী নবী হযরত মোহাম্মদ [সাঃ]। নির্মাণকালীন সময়ে এর দরজা ছিল মোট তিনটি । যা এই সময়ে এসে দাঁড়ীয়েছে প্রধান ফটক ৪১টি সহ মোট ৮৩টি। আজকের আধুনিক পৃথিবীর অন্যতম দৃষ্টি নন্দন মসজিদে নববী- মদিনার কেন্দ্র স্থলে অবস্থিত। ১ম হিজরী ৬২২ খ্রীস্টাব্দে এর নির্মাণকাল। বর্তমানে ৬ লাখ মুসললী ধারণ ক্ষমতা, তবে হজ মৌসুমে ১০ লাখ পর্যন্ত নামাজ আদায় করতে পারা- মসজিদে নববীর বর্তমান মিনার রয়েছে ১০টি। নজরকাড়া প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ৩৪৪ ফুট। এর ভিতরের দৃষ্টি নন্দন কারুকার্য ও আলোক সজ্জা চোখ ধাধিয়ে যায়। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র আরব উপদ্বীপের মধ্যে এখানেই সর্বপ্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। নববীর পুরানা অভিজ্ঞ বাঙ্গালী খাদেম জনাব খলিলুর রহমানের সাথে আলাপ করে জানা গেল প্রতিদিন ফজরের পর বিশাল আকৃতির ২৭টি গুম্বজ বৈদ্যুতিক সাহায্যে সরে যাওয়ার পর সরাসরি বাহিরের আলো মসজিদের মেঝে পর্যন্ত পড়ে। আমি নিজেও একদিন সচক্ষে প্রত্যক্ষ করে অবাক হয়েছি। নববীর ভিতরেই রয়েছে মহানবী হযরত মোহাম্মদ [সা.] রওজা শরীফ ।তাঁর পাশেই হযরত আবুবকর [রা] ও হযরত ওমর [রা.] কবর মোবারক। মসজিদে নববীর মিম্বার হতে রওজা পর্যন্ত স্থানটিকে বলা হয় রিয়াদুল জান্নাত বা জান্নাতের বাগান। এখানে এবাদতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। মসজিদের দক্ষিণ পূর্ব দিকে রয়েছে জান্নাতুল বাকি নামক কবর স্থান। হজরত ওসমান [রা.] ও ফাতিমা [রা.] সহ দশ হাজার সাহাবির কবর রয়েছে। জান্নাতুল বাকি’তে সর্বপ্রথম হযরত আসাদ বিন জারারা [রা.]কে সমাধী করা হয়। মসজিদে নববীর ৫ নং ও ৮ নং গেটের সামনে রয়েছে কোরআন এক্সাভিশন সেন্টার ও রাসুল [সা.] জীবনীর এক্সাভিশন সেন্টার । সেখানে রক্ষিত রয়েছে হাতে লিখা এ যাবৎ পাওয়া বিশ্বের সবচাইতে বড় কোরআন শরীফ সহ হাজার বছর আগের বিভিন্ন সাইজের হস্ত লিখা কোরআন শরীফ।আরো রয়েছে কাবা ঘরের পূর্ব অবস্থা,মসজিদে নববীর প্রথম আকৃতির প্রতিকৃতি। দেয়ালে লাগানো রাসুল [সা.] শিশুকাল হতে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনী সহ নানান নিদর্শন। ইংরেজী ও আরবীতে লিখা রাসুল[সা.]জীবনী ধৈর্য সহকারে পড়লে হাজী ও ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য বেশ শিক্ষণীয় হয়ে রবে।মসজিদে নববীর ২১ ও ২২ নাম্বার গেটের কিছুটা সামনে রয়েছে সুদৃশ্য একটি ঘড়ী। যা আগুন্তকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।তার পাশেই রয়েছে ঝাক বাধা শত শত জালালী কবুতরের অবাধ বিচরণ। যা আপনাকে তপ্ত গরমেও জালালীর উড়াউড়ি চোখে-মুখে প্রশান্তি এনে দেবে।এবার বিদায় ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম মসজিদে নববী হতে,যেখান থেকে সারা দুনিয়ার অর্ধেকেরও বেশী এলাকা শাসন করা হত ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। তাহলে বন্ধুরা আজ এই পর্যন্তই, ইনশাআল্লাহ পরবর্তী কোন সংখ্যায় মদিনা ভ্রমণের আরো গল্প নিয়ে হাজির হব।
যোগাযোগঃ-হজ ও ওমরাহ ভিসায় যাওয়ার জন্য মতিঝিল ও পুরানা পল্টন সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকা প্রথম শ্রেণীর ট্র্যাভেলসের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। তাঁরাই সব ব্যবস্থা করে দিবে।
খরচঃ-হজ ভিসা ৩ লাখ হতে ৫ লাখ ও ওমরাহ ভিসা একলাখ হতে দুই লাখ টাকা মাত্র।খুব শীঘ্রই সৌদি সরকার ভ্রমণ ভিসাও চালু করতে যাচ্ছে।

Share Button
Previous কুষ্টিয়ার খোকসায় ভাইয়ের হাতে ভাই খুন
Next ১৬১ বছরেও কুমারখালী এম এন স্কুল জাতীয়করণ হচ্ছে না !

You might also like

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply