ব্র্যাক ব্যাংকে অনিয়ম

ব্র্যাক ব্যাংকে অনিয়ম

ঢাকা ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ (গ্লোবটুডেবিডি): সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি ইদানিং বেসরকারি ব্যাংকেও ব্যাপক অনিয়ম শুরু হয়েছে। এসএমই ব্যাংকিংয়ের জন্য পরিচিত বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকে এমন অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, নিয়ম বহির্ভুতভাবে বেশি দামে গাড়ি ও অন্যান্য পণ্য কেনা, পর্ষদের অনুমোদিত বেতন কাঠামো না মানা, জালিয়াতির করে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলন, ভুয়া বন্ধকীর মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার মত গুরুতর অনিয়ম করেছে এ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে ব্র্যাক ব্যাংকের এসব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসাবে সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংকের ১৬ শাখায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কার্যক্রম চলে। আর ১৬৫টি শাখার ক্ষেত্রে ওই ব্যাংকের দেওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটি সমন্বিত প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং পরিদর্শন বিভাগ। ওই প্রতিবেদনে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক ১০০ কোটি টাকার বেশি কর জমা দেয়নি। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ১৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আর ২০১৫ সালে ৮২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। একে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যা ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশে বর্ণিত বিধিমালা ৩৫ এর লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ব্যবহারে জন্য বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে তিনটি গাড়ি কেনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে দেয়া তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ লঙ্ঘন করে ২টি টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়ি যার প্রতিটির মূল্য ৭৫ লাখ টাকা করে এবং একটি হোন্ডা ব্র্যান্ডের গাড়ি ৪১ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে। একইভাবে ব্যাংকের ব্যবহারের জন্য অনিয়ম করে বেশি দামে অসংখ্য টেলিভিশন কেনা হয়েছে। আর পরিচালনা পর্ষদে তথ্য গোপন করে ৭৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা অধিক মূল্যে চিপ কার্ড কেনা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রাহককে উপহারের নামে আড়ংয়ের ২৭ লাখ টাকার গিফট ভাউচার দেওয়া হয়েছে। যা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বৃদ্ধির অপকৌশল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একেও গুরুতর অনিয়ম বলে বর্ণনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। হিউম্যান রিসোর্সেস ডিপার্টমেন্টে কর্মরত ফারহান শারমিন সুমি (ভিপি) আগে চাকুরি করতেন আইডিএলসিতে। সেখানে বেতন পেতেন ৯৫ হাজার ৬৮৬ টাকা। ব্র্যাক ব্যাংকে যোগ দেয়ার সময় তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে জানান আগে বেতন পেতেন দুই লাখ ৫৪ হাজার ২৬ টাকা। এর ফলে তিনি অনেক বেশি বেতনে ব্র্যাক ব্যাংকে যোগ দেন। এ নিয়োগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সাতমসজিদ রোড শাখার ভাড়াজনিত ব্যয় সমন্বয় তথা সান্ড্রি ক্রেডিটরস ডেবিট অথরিটি সিস্টেমের মাধ্যমে সাড়ে ১৬ লাখ টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের গুলশান শাখার গ্রাহক ইয়াসমিন এ রহমানের ৫১ লাখ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আলোচ্য শাখায় কর্মরত কর্মকর্তা তানভির হোসেন আত্মসাত্ করেছেন। ইউনিলিভার বাংলাদেশ- এর ৩০ লাখ টাকা ব্যাংকের অ্যাসোসিয়েট ম্যানেজার সুকুমার রায় তার স্যালারি অ্যাকাউন্টে জালিয়াতির মাধ্যমে স্থানান্তর করে আত্মসাত্ করার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসঙ্গে সুকুমার রায় ইউনিলিভার বাংলাদেশ-এর আরো সাড়ে ৯৪ লাখ টাকা মেসার্স নাফিসা ট্রেডার্সের হিসাবে নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থানান্তর করে আত্মসাত্ করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল দলিলে প্রকৃত মালিকের ছবি পরিবর্তন করে ভিন্ন ব্যক্তির ছবি দিয়ে ব্যাংকের অনুকুলে জমির বন্ধকী সম্পাদন, কারখানার মালিকানার তথ্যে জালিয়াতি ও গ্যারান্টরের তথ্যে জালিয়াতি করে শান্তিনগর এসএমই সেলস অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টারের গ্রাহক মেসার্স মায়ের দোয়া গার্মেন্টসকে তিন কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ব্যাংকের শান্তিনগর, এসএমই এসসি শাখায় মোহাম্মদ কিরণ মিয়ার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স কিরণ সুজের অনুকুলে মেয়াদী ঋণ তিন কোটি টাকা এবং ওডি এক কোটি ৮০ লাখ টাকা ও ৫০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়ার সময় তৃতীয়পক্ষের মালিকানাধীন জমি ব্যাংকের অনুকুলে জালিয়াতির মাধ্যমে বন্ধকী গ্রহণ করা হয়েছে।

এফডিআর ক্ষেত্রে রেভিনিউ স্ট্যাম্প না ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ বাদে এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিত স্প্রেড (আমানত ও সুদের হার) মানা হয়নি। ঋণ প্রসেসিং ফি নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। ব্যাংকের অনেক চাকুরিচ্যুত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিত নিয়ম মানা হয়নি। এভাবে আরো অনেক অনিয়মের কথা ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলা হয়, আগেই বিষয়গুলো সমাধান করা হয়েছে।

Share Button
Previous এবার নিরব-জলির ‘অফিসার রিটার্নস’
Next পশ্চিমতীরে সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৪০

You might also like

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply