যৌতুক প্রথা এবং একজন নারী/ সাবেরা সুলতানা

যৌতুক প্রথা এবং একজন নারী/ সাবেরা সুলতানা

ইসলামী দর্শণে মুসলিম বিবাহে যৌতুক থাকার কথা নয়। কিন্তু ভারতবর্ষে কীভাবে মুসলিমদের ভিতর যৌতুক প্রথা চালু হয়ে গেল, এটা একটা গবেষণার বিষয়। কোন কোন মুসলিম দেশে বরং উল্টো নিয়ম চালু আছে। সেটা হলো কন্যার বাবাকে পণ দিয়ে বিয়ে করতে হয়। যৌতুক নেওয়া এবং দেওয়া দুই-ই খারাপ এবং জঘন্য অপরাধ। যৌতুক প্রথা নারীকে কেনা-বেচা ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারতে মুসলিম শাসকেরা সামাজিক উন্নয়নে অনেক ভালো কাজ করেছিল কিন্তু হিন্দুদের যৌতুকপ্রথা তারা  নিজেদের করে নিয়েছে অথবা তারা ধর্ম বিশ্বাস বদল করেছে বটে। কিন্তু তাদের সংস্কৃতি থেকে গেল আগের মতোই।

স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশের নারীরা সাংবিধানিকভাবে অনেক অধিকার অর্জন করেছে। এখানে যৌতুক দাবী করা এবং যৌতুক আদান-প্রদান করা দন্ডনীয় অপরাধ। যৌতুকবিরোধী এই আইনটি নারীদের অনেক কাজে লাগে। নারীর নিরাপত্তাও জোরদার হয়েছে। তবে সমাজে যৌতুকের মারাত্মক প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। সবচেয়ে কৌতুককর বিষয় হলো, সমাজের উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত সর্বস্তরেই এখনো যৌতুক দেওয়া-নেওয়া হয় আইনতঃ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও। এর থেকেই বোঝা যায় সমাজে এবং পরিবারে নারীর অবস্থান কেমন। তবে কি কন্যা সন্তান পরিবারে এখনো বোঝা স্বরূপ?

নারী জীবনের বিষণ্ণতার কোন শেষ নেই। নারী কোন অবস্থায়ই নিরাপদ নয় সংসারে। পরিবারে সহিংসতার ঝুঁকি একজন নারীকে সারাজীবন বহন করতে হয়। মধ্যবয়স পার করার পরও স্বামীর নিকট নিরাপদ হয় না নারীর জীবন- শুনতে হয় “চলে যাও আমার বাড়ি থেকে।” কোথায় যাবে নারী, কেন যাবে?

নারী তার পরম ভালবাসা দিয়ে স্বামীর সাথে সংসার গড়ে তুললো, সন্তান লালন-পালন করলো, তার কি কোন মূল্য নেই? যখন তখন নারীকে শুনতে হয় “চলে যাও”। এর অর্থ হলো নারীর পায়ের নীচে মাটি নেই। এক কূল ছেড়ে অন্য কূলে গেছে, সেই কূলেও ঠাঁই নেই। ফেরারও কোন জায়গা নেই। বাপের বাড়ি থেকে যৌতুক এনেও কি নারী স্বস্তিতে থাকে? বাপের বাড়ি থেকে অর্থ আনার পরও নির্যাতনের শিকার হতে হয়- নির্মম আচরণের শিকার হতে হয়।

বাংলাদেশে যৌতুকবিরোধী আইনের পাশাপাশি যৌতুকপ্রথা বিলোপের একটা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দরকার। শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে যৌতুক বন্ধ করা সম্ভব নয়। মানুষের মনের গভীরে লোভ আর পাপ ক্রিয়াশীল থেকে গেছে। সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ছাড়া এই লোভ থেকে মুক্তি নেই।

নারীকে আত্মমর্যাদার নতুন পথের সন্ধান করতে হবে। নিজের নিরাপত্তা কেবল স্বামী, সংসারের মধ্যে সন্ধান করলে চলবে না। সমাজ, রাষ্ট্র ও আইন সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে তার নতুন নিরাপদ জীবনের পথ খুঁজতে হবে। নারীকে তার মানবজীবনের মর্যাদা লাভের জন্য জীবনচক্রের পুরানো মূল্যবোধ ভেঙ্গে নতুন জীবন চেতনায় নিজেকে গড়ে নিতে হবে। সুখী হওয়ার ভাবনাও বদলে নিতে হবে।

নিজের অধিকার নিজে আদায় না করে নিলে যৌতুকের জীবন ব্যবস্থাপনায় তাকে ডুবে থাকতে হবে। মাথা উঁচু করে পৃথিবী দেখা হবে না কোনদিন।

Please follow and like us:
Previous জরিপের ভিত্তিতেই মনোনয়ন : শেখ হাসিনা
Next ঐক্যফ্রন্টের সব দলই ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করবে : মান্না

You might also like

০ Comments

No Comments Yet!

You can be first to comment this post!

Leave a Reply